বন্যা অসমের জনজীবনে নতুন ঘটনা নয়। কয়েক লক্ষ মানুষ বন্যাকবলিত, বহু মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মৃত্যু, বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি ঘটলে সহায়-সম্বলহীনদের ঘরে ফেরার প্রচেষ্টা, জলকাদার স্তূপ সরিয়ে সামান্য সম্বলটুকু খুঁজে ফেরার পালা— বছরের পর বছর প্রায় এই একই দৃশ্যপটের পুনরাবৃত্তি হয়ে চলেছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এল নিনিয়ো-র প্রভাবে অবশিষ্ট ভারত যখন বৃষ্টিহীনতার আশঙ্কায় ভুগছে, তখনও উত্তর-পূর্ব ভারতে অসমের বিস্তীর্ণ অঞ্চল মরসুমি বন্যার জল ঠেলছে, যার সবটুকু দায় প্রকৃতির রুদ্ররূপের উপর চাপালে ঘোর অন্যায় হবে। এই বছরের বন্যায় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিবসাগর জেলাটি। চরাইদেও, গোলাঘাট, কামরূপ, ধেমাজির অবস্থাও তথৈবচ। সম্প্রতি বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে, আশ্রয়শিবির ছেড়ে অনেক মানুষ স্ব-স্থানে ফিরতেও শুরু করেছেন। কিন্তু বর্ষার মরসুম এখনও ফুরোয়নি, তদুপরি বেশ কিছু নদীর জল এখনও বিপদসীমার উপরে। ফের অতিবৃষ্টির পূর্বাভাসটি মিলে গেলে উত্তর-পূর্বের বন্যা পরিস্থিতি জটিলতর হবে।
আপাতত পরিস্থিতির মোকাবিলায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, গৃহহীনদের ঘরে ফেরানো, পুনর্বাসনের ব্যবস্থার রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। ত্রাণবণ্টন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও হয়েছে। কিন্তু তার পর? কেন বার বার বন্যার পর একই আশ্বাসবাণী নানা সুরে আওড়াতে হয় সরকারকে, কেন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিজ্ঞানসম্মত অত্যাধুনিক নানা প্রকল্পের কাহিনি শোনানোর পরও খাস গুয়াহাটিতে এক দফা প্রবল বৃষ্টির পর স্থানীয়দের উদ্ধারে নৌকা নামাতে হয়— সে প্রশ্নের উত্তর নেই। বরং, দায়িত্বপ্রাপ্তরা ব্যস্ত থাকেন পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলি থেকে নেমে আসা বৃষ্টির জলের তোড়ের উপর দোষ চাপাতে। ঘটনা হল, উঁচু পাহাড়ি জায়গা থেকে বৃষ্টির জল সমতলের দিকে নেমে আসবে, এমনটাই স্বাভাবিক। সেই অনুযায়ী, লাগোয়া শহরগুলির নিকাশিব্যবস্থাকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। সেই কাজের প্রমাণ গুয়াহাটির মতো বড় শহরগুলিতে কোথায়? তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গোটা রাজ্যে বেহিসাবি অরণ্য উচ্ছেদ এবং ব্রহ্মপুত্র-সহ মূল নদীগুলির খাত পলি পড়ে প্রায় ভরাট হয়ে আসার ঘটনা। শৈশবের ভূগোল শিক্ষাও জানে, ঘন জঙ্গল মাটিকে বেঁধে রাখতে সাহায্য করে, বৃষ্টির জলে তাকে ধুয়ে যেতে দেয় না। সেই আচ্ছাদন হ্রাস পেলে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পায়, এবং সেই ধুয়ে যাওয়া মাটি নদীখাতগুলিকে ক্রমশ আরও ভরাট করতে থাকে। স্বাভাবিক ভাবেই নদী ভারী বৃষ্টির সময় জল ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়।
অসমের বন্যা পরিস্থিতিকে ‘মনুষ্যকৃত বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে সিবিআই তদন্ত চেয়েছে ‘কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতি’। তারা জানিয়েছে, শুধুমাত্র অত্যধিক বৃষ্টিপাতই নয়, বরং বেআইনি ভাবে কয়লা, পাথর এবং বালি উত্তোলনের কারণেই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানও এ বার বন্যায় ভেসেছে। বহু বার সরকারকে সতর্ক করা হলেও তারা কর্ণপাত করেনি। বেআইনি খাদান, যত্র তত্র পাহাড় কাটা, এবং নদী থেকে বালি, পাথর সরানোর ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা বৃষ্টির জলকে আটকে রাখার উপায় আর অবশিষ্ট নেই। প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ লুট বন্যাপ্রবণ অসমকে আরও বিপজ্জনক, বিপর্যস্ত করে তুলছে। নাগরিককে বিপদের মুখে ঠেলে কার স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত সেখানকার বিজেপি সরকার?