পশ্চিমবঙ্গ কোন দিকে কতখানি পাল্টাচ্ছে, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ গত তিন দিনের মধ্যে পাওয়া গেল। প্রথমত একই দিনে দুই বেলা দু’টি এনকাউন্টার হত্যা ঘটল। দ্বিতীয়ত একই ঘটনার জেরে দুই বেলা অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী দুই পক্ষকেই খালি গায়ে পাড়ায় হাঁটানো হল— প্রথম বার অভিযুক্তকে হাঁটাল অভিযোগকারী, দ্বিতীয় বার অভিযোগকারীকে হাঁটাল পুলিশ। এই সমস্ত ঘটনাতেই পশ্চিমবঙ্গের এক বিরাট অংশের মানুষের উৎসাহ, এমনকি উল্লাস, সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হল। এনকাউন্টারে নিহত তরুণের বাবা-মাও প্রাথমিক ভাবে প্রশাসনিক ভূমিকায় সন্তোষ ব্যক্ত করলেন। মন্ত্রী ও নেতাদের তো কথাই নেই। তাঁরা ক্ষমতালাভের আগে থেকেই ‘সকালে জমা বিকালে খরচ’ নীতিতে আস্থা জানিয়েছিলেন, এখন তাঁরা প্রমাণ করছেন, যেমন কথা তেমন কাজ। একাধিক মন্ত্রী জানিয়েছেন, দুষ্কর্ম করলে দুষ্কৃতীকে ‘শেষ’ করে দেওয়াই উচিত, এই ভাবেই পশ্চিমবঙ্গ স্বচ্ছ ও নিরাপদ হবে। জামাকাপড় খুলিয়ে সর্বসমক্ষে হাঁটানোর চলটি তো নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর থেকেই বিরাট প্রশাসনিক উৎসব ও জনতার অবিমিশ্র উল্লাসের পরিসরে পরিণত। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আবহটি দ্রুত পরিবর্তনশীল— সমাজ ও রাজনীতির এই যৌথ ভাবসম্মিলনের প্রেক্ষিতে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। বরং আলোচনা করা যেতে পারে, পরিবর্তনের নিহিত দর্শনটি নিয়ে। আশা, সীমিতসংখ্যক নাগরিকের কাছে এখনও এই দর্শনের কিয়ৎ প্রাসঙ্গিকতা থাকতেও পারে।
আইনের শাসন কেন জরুরি, শাসকের কাছে সে কথা বলা ‘মায়ের কাছে মাসির বাড়ির গল্প’-এর মতোই। তাঁরা বিলক্ষণ জানেন, কোনটা করণীয়। তাঁরা এও জানেন, তাঁরা কী করবেন। বরঞ্চ সমাজের অবগতির জন্যই কথাগুলি বলা দরকার। অপরাধ শেষ করো, অপরাধীকে নয়: এই সব নীতিকথা কি সত্যিই একুশ শতকীয় দক্ষিণাবর্তে পথ হারিয়েছে? নেতা-মন্ত্রীদের মতোই কি নাগরিকও এখন মনে করেন, অপরাধীর বেঁচে থাকার যুক্তি নেই? অথচ অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে শাস্তিদান উচিত নয়, এবং অপরাধীর অপরাধ সত্ত্বেও তার বেঁচে থাকার অধিকার গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ছিনিয়ে নিতে পারে না— ব্যতিক্রমী ঘটনা ব্যতিরেকে— বিচারের এই প্রারম্ভিক সূত্রগুলিও কি এ দেশে আর মান্য নয়? কোনও ঘটনায় জনৈক ব্যক্তিকে অপরাধী বলে মনে হলেও শাস্তিদানের আগে দেশে প্রচলিত আইনের কাঠামো অনুসারে বিচারপদ্ধতির মাধ্যমে তার অপরাধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে— বর্তমান ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ কি এই পথ ত্যাগ করেছে? এতে কত বড় ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে, সেটা ভাবলে ত্রাসের শিহরন জন্মায়। এনকাউন্টার হত্যা একটি চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক এবং অমানবিক কাজ— এই কথাটি গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগত যুক্তি, কোনও আবেদন-নিবেদনের বিষয় নয়।
অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তার বিচার হবে, বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে। এর মধ্যে জামা খুলিয়ে প্রকাশ্যে ঘোরানোর স্তরটি কোথা থেকে আমদানি হল? পশ্চিমবঙ্গ কি এখন গণতন্ত্র ছেড়ে খাপ পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠায় নেমে পড়েছে? আসলে নানা ভাবে সমাজে ত্রাসের রাজত্ব তৈরির চেষ্টা চলছে, ডিম আক্রমণ থেকে নির্বস্ত্র হাঁটানো থেকে এনকাউন্টার— এরই বিভিন্ন পন্থা। দু’টি কথা এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, কঠোর দমনের ফলে অপরাধ-প্রবণতা কমে যায়, পরিসংখ্যানগত ভাবে এমন দাবি করা অসম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার আসার পর গত কয়েক মাসেও যে পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তাতেও তার প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, যত ক্ষণ পর্যন্ত সাংবিধানিক ভাবে এই দেশ একটি গণতন্ত্র, তত ক্ষণ যে কোনও প্রশাসনের প্রথম দায় সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি। তা না হলে, শাসন নয়, অপশাসন বলতে হয়।