অগ্নিগর্ভ পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে)। ২৭ জুলাইয়ের নির্বাচনের আগে নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে নাগরিক সংগঠন ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি) গত জুনের শুরুতে অধিকৃত অঞ্চলের রাজধানী মুজাফ্ফরাবাদে একটি প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেওয়ার পর থেকেই অঞ্চলটি হিংসাত্মক বিক্ষোভে জর্জরিত হয়ে আছে। তিন ধাপে অনুষ্ঠিত ভোটগ্রহণ পর্বটি চলবে ১০ অগস্ট পর্যন্ত। এ দিকে, সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া এক পরিচিত পন্থাই অবলম্বন করেছে: দমন-পীড়ন, অস্বীকার এবং মূল প্রসঙ্গ থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা। এ যাবৎ বিক্ষোভকারীদের উপর পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মম দমন-পীড়নের জেরে নিরাপত্তা রক্ষী-সহ কমপক্ষে ৩৫ জন নিহত এবং অন্তত দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। বস্তুত, পিওকে-তে যে বিক্ষোভ চলছে, তা কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই নয়। এমনিতেই বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, অপর্যাপ্ত জনসেবা এবং পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের অত্যধিক হস্তক্ষেপ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে, সাম্প্রতিক সংঘাতের অন্যতম কারণ, পিওকে বিধানসভায় ‘শরণার্থী’দের জন্য সংরক্ষিত আসন নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক, যা সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরকে দুর্বল করে দেয়।
লক্ষণীয়, পিওকে বিধানসভার আসন সংখ্যা ৫৩টি। আটটি সংরক্ষিত আসন বাদে ৪৫টি আসনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে আবার ১২টি আসন জম্মু ও কাশ্মীরের সেই সব শরণার্থীর জন্য সংরক্ষিত, যাঁরা পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেন। অভিযোগ হল, পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের বাসিন্দারা এই আসনগুলির জন্য ভোট দেন না বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন না। সাধারণত কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলই এই ১২টি আসন পেয়ে থাকে এবং স্থানীয়দের মতে, পিওকে-র বিধানসভায় নিজেদের কর্মসূচি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য ইসলামাবাদ এই আসনগুলোকে ব্যবহার করে। এমতাবস্থায় জেএএসি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত এই ১২টি আসন অবলুপ্ত করার দাবি তুললেও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে, আসনগুলি সংবিধানের আওতায় সুরক্ষিত এবং কেবল আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমেই এগুলো বিলুপ্ত করা সম্ভব। ফলে, আরও তীব্র হয়েছে গণ-আন্দোলন। পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলি মূলত নির্দিষ্ট দাবি বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, সাম্প্রতিক আন্দোলনটি আইনি সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দায়ের প্রশ্ন তুলেছে।
পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন আঞ্চলিক নির্বাচনও সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত হয় না। সাম্প্রতিক নির্বাচনে কারচুপিরও অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে। সমস্যা হল, পর্যায়ক্রমিক নির্বাচন আয়োজন প্রকৃত রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের অভাব পূরণ করতে পারে না। পিওকে-র দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বা স্থিতিশীলতা কোনও প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং এই অঞ্চলের মানুষকে প্রকৃত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং কোনও ভয় ছাড়াই ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর নির্ভর করছে— কথাটি পাকিস্তান প্রশাসন বুঝলে তবেই পিওকে-তে শান্তি ফেরার সম্ভাবনা।