E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

লেখকের দাবি

বাংলা প্রকাশনার জগতে পথের দাবী এক মাইলফলক। আজ কোনও সুপারস্টারের সুপারহিট ছবি ঘিরে যে উত্তেজনা দেখা যায়, একশো বছর আগে একটি বাংলা বই নিয়ে সেই আলোড়ন তৈরি হয়েছিল।

শেষ আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬ ০৪:৩২

ইংরেজি পরীক্ষায় প্রথম পত্রে রচনা লেখার বিষয় ছিল ‘প্রিয় উপন্যাস’। ম্যাট্রিক পরীক্ষার ছাত্রী বীণা দাস চার পাতা লিখে এলেন পথের দাবী নিয়ে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসটি তখন তাঁর মন জুড়ে বসেছে— “একবার পড়ে কি আর আশ মেটে— কেবলই পড়ি, বারে বারে পড়ি— শেষে বইটা যেন আগাগোড়া মুখস্থ হয়ে গেল,” লিখছেন আত্মজীবনী শৃঙ্খল ঝঙ্কার-এ। শুধু পড়াই নয়, বন্ধুদের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে তর্ক। বাবা বেণীমাধব দাস কটকের র‌্যাভেনশ স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন তাঁর অনুরক্ত ছাত্র। মেজদা অসহযোগ আন্দোলনে জেল খেটেছেন। সেই মেয়ের প্রিয় উপন্যাস যে হবে পথের দাবী, তাতে আর আশ্চর্য কী। কিন্তু স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রীর মাথায় হাত— বইটা যে নিষিদ্ধ! পেপারটাই বাতিল হয় যদি! শেষ অবধি বাতিল হয়নি, তবে খেসারত দিতে হয়েছিল অনেকগুলো নম্বর। ছাত্রীটি অবশ্য পথের দাবী-র শিক্ষাই গ্রহণ করেছিল মনে-প্রাণে, ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করে হত্যা করার চেষ্টা করেন বীণা দাস। গুলি লাগেনি, কিন্তু ঘটনার অভিঘাতে কেঁপে উঠেছিল দেশ। এ বছর উপন্যাসটির শতবর্ষ— ১৯২৬ সালের অগস্ট মাসে বই আকারে প্রকাশিত হয় পথের দাবী। তার আগে বঙ্গবাণী পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। বই প্রকাশকে ঘিরে উন্মাদনার নানা গল্প আজও যেমন আশ্চর্য করে, তেমনই চিন্তা উস্কে দিয়ে যায় বইটিকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের পত্রালাপ। লেখকের স্বাধীনতা, নাগরিকের কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দু’পক্ষের শাণিত কথাগুলির ধার আজও কমেনি।

বাংলা প্রকাশনার জগতে পথের দাবী এক মাইলফলক। আজ কোনও সুপারস্টারের সুপারহিট ছবি ঘিরে যে উত্তেজনা দেখা যায়, একশো বছর আগে একটি বাংলা বই নিয়ে সেই আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। রীতিমতো ‘ব্ল্যাক’ হয়েছিল বইয়ের কপি— পঞ্চাশ-একশো টাকাতেও নাকি এক-একটা বই বিক্রি হয়েছে সে সময়ে। বই হয়ে বেরোনোর আগে বঙ্গবাণীতে ধারাবাহিক ভাবে চব্বিশ কিস্তিতে বেরিয়েছিল পথের দাবী। প্রধান চরিত্র ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ সব্যসাচী মল্লিক, তুখোড় বুদ্ধিমান এবং অসমসাহসী এক যুবক। বর্মাতে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বিপ্লবের তোড়জোড় করছে সে। প্রতিটি কিস্তির তর্জমা করাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার, জানতে প্রকাশকরা পিছিয়ে গেলে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র উমাপ্রসাদ বইটি প্রকাশ করেন। প্রথম সংস্করণের তিন হাজার কপির এক হাজার নাকি এক দিনের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়, বাকিগুলিও ফুরিয়ে যায় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে। ১৯২৭ সালের জানুয়ারিতে যখন বই বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ আসে, একটিও কপি বাজারে খুঁজে পায়নি পুলিশ। এ সব কথা আজ কিংবদন্তি— নানা স্মৃতিচারণায় ছড়িয়ে রয়েছে, যাচাই করা কঠিন।

তবে রয়ে গিয়েছে দু’টি চিঠি। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করবেন, এই আশায় চিঠি লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “রাজশক্তির আছে গায়ের জোর। তার বিরুদ্ধে কর্তব্যের খাতিরে যদি দাঁড়াতেই হয়, তাহলে অপরপক্ষের থাকা উচিত চারিত্রিক জোর। অর্থাৎ আঘাতের বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতার জোর।” ইংরেজ ছাড়া অন্য কোনও শাসক লেখককে কাঠগড়ায় না তুলে কেবল বইকে নিষিদ্ধ করত না, এ-ও লেখেন রবীন্দ্রনাথ। ক্ষুব্ধ শরৎচন্দ্র একটা জবাবি চিঠি লেখেন, যদিও চিঠিটি পাঠাননি। তাতে তিনি লিখেছিলেন, ক্ষমার প্রত্যাশা তাঁর ছিল না— “...যদি রাজরোষে শাস্তিভোগ করতে হয় ত করতেই হবে— তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি। কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়? প্রতিবাদেরও দণ্ড আছে, এবং মনে করি তারও পুনরায় প্রতিবাদ আবশ্যক। নইলে গায়ের জোরকেই প্রকারান্তরে ন্যায্য বলে স্বীকার করা হয়।” রাজরোষে বিপন্ন প্রতিবাদীর প্রতি আর পাঁচ জনের কর্তব্য কী, এ প্রশ্নটি আজও নাড়া দিচ্ছে, তাই আজও কথাগুলো জরুরি। শাসকের অবজ্ঞার থেকে প্রত্যাঘাতের মূল্য বেশি, এবং তা সহ্য করতে তৈরি থাকতে হবে প্রতিবাদীকে, রবীন্দ্রনাথের এ কথাগুলি যথার্থ। কিন্তু সত্যবাদীর উপর অকারণ বলপ্রয়োগের প্রতিবাদ না করলে শাসকের স্বৈরাচারকেই সমর্থন করা হয় না কি? ক্ষমতান্ধ শাসকের কাছে শাস্তিই প্রত্যাশিত, কিন্তু সহ-নাগরিক? তাঁদের কাছে কী প্রত্যাশা করতে পারেন লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকার, সে কথাটাও সমাজকে চিন্তা করতে হবে। ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যকথনের দায় সৃজনশীল মানুষের, কিন্তু সেই মানুষটির সুরক্ষার দায় কার? বাক্‌স্বাধীনতার আইনি সুরক্ষা যখন ব্যর্থ, তখন পাঠককেই দাঁড়াতে হয় লেখকের পাশে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Pather Dabi Sarat Chandra Chattopadhyay Bengali Literature Bengali Author

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy