E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

প্রলয়ঙ্কর

হিমালয়ের কোলে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন অঞ্চল বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে এখন এমনই এক ভয়ঙ্কর মৃত্যু-ফাঁদে পরিণত হয়েছে, যেখানে যে কোনও মুহূর্তে, রোদ ঝকঝকে আপাত-শান্ত দিনেও প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধরে নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে সমস্ত কিছু।

শেষ আপডেট: ২৯ অগস্ট ২০২৬ ০৮:৩৪

হড়পা বান, ভূমিকম্প এবং তুষারধস— পাহাড়ি অঞ্চলের দুঃস্বপ্ন। নেপালের অতীব দুর্ভাগ্য, তাকে একত্রে এই তিন ধরনের বিপর্যয়ের সম্মিলিত পরিণতিটি প্রত্যক্ষ করতেহল। এবং বিপদ এখনও কাটেনি। বরং, তিব্বতের দিকে তুষারধসে সৃষ্ট হ্রদ উপচে জল নামতে শুরু করায় আর এক দফা প্লাবনের প্রহর গুনছে নেপাল। সতর্ক করেছে চিনও। ইতিমধ্যেই হাজারের অধিক মানুষ নিখোঁজ। রয়েছেন অনেক ভারতীয়ও, যাঁদের অধিকাংশই কৈলাস-মান সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে নেপাল-চিন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জড়ো হয়েছিলেন। বিভিন্ন ভিডিয়োতে বিপর্যয়ের যে চিত্র ধরা পড়েছে, তা সহসা দেখে ‘বাস্তব’ বলে মনে হয় না। বিশাল উচ্চতার কাদাজলের ঢেউ উন্মত্ত গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অভিবাসন কেন্দ্রের আশপাশের অঞ্চলে, মুহূর্ত-মধ্যে গ্রাস করে নিয়েছিল উঁচু বাড়ি, রাস্তা, দাঁড়িয়ে থাকা বাস-গাড়ি— সব কিছু। সে দৃশ্য দেখে মনে হয় প্রযুক্তির কারসাজি, চলচ্চিত্রের পর্দায় হামেশাই যেমনটি দেখা যায়। মর্মান্তিক সত্য এটাই যে, এর মধ্যে তিলমাত্র কল্পনা মিশে নেই, সবটাই চরম বাস্তব। হিমালয়ের কোলে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন অঞ্চল বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে এখন এমনই এক ভয়ঙ্কর মৃত্যু-ফাঁদে পরিণত হয়েছে, যেখানে যে কোনও মুহূর্তে, রোদ ঝকঝকে আপাত-শান্ত দিনেও প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধরে নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে সমস্ত কিছু।

কেন এমন ভয়াবহ বিপর্যয়— তার নানা ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। প্রাথমিক ধাক্কা কাটলে অনুমান পর্ব পেরিয়ে নিশ্চিত কারণের দিকে হয়তো আরও কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু একটি বিষয়কে এখনই স্বীকার করে নেওয়া ভাল— বিশেষজ্ঞরা বহু আগে থেকে বহু বার যে সতর্কবার্তা দিয়ে এসেছিলেন নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা হিমালয় সম্পর্কে, বিগত কয়েক বছরে তা বর্ণে বর্ণে সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে। উষ্ণায়নের কারণে অপ্রত্যাশিত মাত্রায় হিমবাহের গলন এই পর্বতমালার অন্দরে-কন্দরে এমন সব মারণাস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে, যার এক-এক বারের প্রয়োগে বিস্তীর্ণ এলাকা স্রেফ ‘নেই’ হয়ে যেতে পারে, নেপাল, সিকিম, উত্তরাখণ্ডের মতো। এবং সেই মহা বিপদ থেকে পরিত্রাণের আর কোনও পথই সম্ভবত খোলা নেই। তাই বারে বারেই অসহায় ভাবে দেখতে হবে কী ভাবে পাহাড়ি নদী হঠাৎ ভয়াল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সাজানো-গোছানো জনবসতির উপর। প্রযুক্তিতে ধরা পড়বে প্রাণভয়ে কী ভাবে মানুষ ছুটে বাঁচতে চাইছে সেই সাক্ষাৎ-মৃত্যুর হাত থেকে কিন্তু পারছে না, কিছু পরেই সব ধুয়ে মুছে কাদামাখা বিবর্ণ বিধ্বস্ত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে এক আস্ত লোকালয়। তেরো বছর আগে কেদারনাথ দিয়ে যার শুরু, সেই ‘হিমালয়ের সুনামি’ কিন্তু নেপালেই শেষ হবে না। দুঃসহ স্মৃতি কাটিয়ে না উঠতেই ফের হয়তো আরও এক বিপর্যয় সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নেবে। আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, মৃত-আহতের সংখ্যা গোনা এবং ক্ষতিপূরণের অঙ্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে সংশ্লিষ্ট দেশ-রাজ্য-জেলার প্রশাসন। কারণ, সেই বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আর তাদের হাতে নেই।

এই মাপের প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে রোখার ক্ষমতা মানুষের হাতে থাকে না ঠিকই, বিশেষত অনেক বিশেষজ্ঞই যেখানে এই ক্ষেত্রে উপত্যকার উপর হিমবাহের এক বিশাল অংশ ধসে পড়ার কারণটিতে জোর দিচ্ছেন। কিন্তু যেটুকু আটকানোর ক্ষমতা সরকারের হাতে ছিল, সেই কাজও কি করা হয়েছিল? পাহাড়ি নদীর দু’পাশে, প্রায় নদীর ঘাড়ের উপর বহুতল, রাস্তা নির্মাণ, যেখানে-সেখানে বাঁধ নির্মাণ করে পাহাড়ি নদীর গতি নিয়ন্ত্রণের অক্ষম চেষ্টা, জঙ্গল উড়িয়ে ‘উন্নয়ন’-এর গান গাওয়া— এর প্রত্যেকটি হিমালয়ের ভূপ্রকৃতিকে তিলে তিলে শেষ করেছে। শুধু নেপাল নয়, সিকিম, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল— সর্বত্র প্রতি বছর বিপর্যয় যে ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে, তার পিছনে এই নির্বুদ্ধিতা অনেকাংশে দায়ী। শয়ে শয়ে প্রাণ প্রতি বছর সেই নির্বুদ্ধিতারই খেসারত দিয়ে চলেছে, আগামী দিনেও চলবে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Nepal flood

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy