E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

এক পয়সার পালা

প্রাইম মিনিস্টার্স সিটিজ়েন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিলিফ ইন ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনস— এই দীর্ঘ নামটি সংক্ষিপ্তাকারে হয়েছিল পিএম-কেয়ার্স। সংক্ষিপ্ত নামের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় এই রকম— প্রধানমন্ত্রী (সাধারণ মানুষের) পরোয়া করেন।

শেষ আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৩২

একশো টাকা জমায় খরচ হয়েছে এক পয়সা। চুম্বকে এটাই পিএম-কেয়ার্স তহবিলের জমা-খরচের হিসাব। দীর্ঘ বিলম্বের পর গত মাসে জানা গেল, ২০২৫-এর ৩১ মার্চ অবধি তহবিলে জমা রয়েছে ৮৪৫২ কোটি টাকা, আর হিসাবের শেষ অর্থবর্ষ ২০২৪-২৫’এ খরচ হয়েছে তার ০.০১ শতাংশ। অর্থাৎ, যে উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সালের মার্চে এই তহবিল চালু করেছিলেন— কোভিড-এর মতো আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ত্রাণের ব্যবস্থা করা— তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। প্রাইম মিনিস্টার্স সিটিজ়েন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিলিফ ইন ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনস— এই দীর্ঘ নামটি সংক্ষিপ্তাকারে হয়েছিল পিএম-কেয়ার্স। সংক্ষিপ্ত নামের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় এই রকম— প্রধানমন্ত্রী (সাধারণ মানুষের) পরোয়া করেন। বিপণনের দুনিয়ায় এমন নামের গুরুত্ব বিপুল। কিন্তু, তা ব্যতীত এমন একটি তহবিল চালু করার আর কোনও কারণ ছিল কি না, ছ’বছর আগেও সে প্রশ্ন উঠেছিল। তখনও সে প্রশ্নের কোনও সদুত্তর মেলেনি। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ত্রাণের ব্যবস্থা করার জন্য প্রাইম মিনিস্টার্স ন্যাশনাল রিলিফ ফান্ড ছিলই। কোভিডের মতো পরিস্থিতিতে সেই তহবিলকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টাই যথাযথ হত। তার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী নতুন তহবিল চালু করলেন। তাতেও সমস্যা ছিল না, যদি সেই তহবিলের টাকা মানুষের প্রয়োজনে কাজে লাগত। পরিসংখ্যান বলছে যে, তা হয়নি। অতএব, তহবিলটি কেন চালু করা হয়েছিল, দেশের নাগরিক আরও এক বার এই প্রশ্নের উত্তর দাবি করতে পারেন।

সমস্যা অন্তত দু’টি স্তরে। প্রথমটি হল, তহবিলে এই বিপুল পরিমাণ টাকা থাকা সত্ত্বেও তা খরচ করা হল না কেন? কেউ বলতেই পারেন, কোভিড-এর মাপের বিপর্যয় সাম্প্রতিক কালে আর ঘটেনি, ফলে এই তহবিলের টাকা খরচ করার যৌক্তিকতাও তৈরি হয়নি। কথাটি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তহবিলের টাকা কোন খাতে এবং কেন খরচ হওয়ার কথা, সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ধারণা অন্তত জনপরিসরে নেই। ২০২০ সাল থেকে যে টাকা খরচ হয়েছে, তার একটা অংশ গিয়েছে সরকারি হাসপাতালের জন্য বিভিন্ন যন্ত্র কেনার কাজে; প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মোতাবেক শিশুকল্যাণ খাতেও টাকা খরচ হয়েছে; আবার, প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে, কিছু ক্ষেত্র থেকে বরাদ্দ টাকা ফেরতও এসেছে। কোন খাত থেকে, তা জানার উপায় নেই; কেন টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, কেনই বা তা খরচ না হয়ে ফেরত এল, সে সবও অজ্ঞাত। ফলে, সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করতেই পারেন যে, তহবিলে এত টাকা খরচ না হয়ে পড়ে রয়েছে কেন— এমন কি কোনও খাত নেই, যেখানে এই অর্থের প্রয়োজন? এই প্রশ্নের যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর দেওয়া মুশকিল।

সমস্যার দ্বিতীয় স্তরটির উৎপত্তি এখানেই— পিএম-কেয়ার্স নামক তহবিল সম্বন্ধে অপার অস্বচ্ছতা। ইতিপূর্বে তথ্যের অধিকার আইনের অধীনে এই তহবিলের সম্বন্ধে তথ্য আদায়ের আবেদন নাকচ হয়েছে— জানা গিয়েছে, এটি সরকারি তহবিল নয়, জনপরিসরের তহবিল, তাই তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় পড়ে না। তহবিলটির নামে যখন ‘সিটিজ়েন’ অর্থাৎ নাগরিক কথাটি রয়েছে, তখন তা জনপ্রতিনিধিদের বিবেচ্য হওয়ার কথা। কিন্তু, সংসদের পরিসরে এই বিষয়ে কখনও প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা হয়নি। এমনকি, এ বারের রিপোর্টটিও প্রকাশিত হল সংসদের বাদল অধিবেশন শেষ হওয়ার পরে, ফলে বিরোধীরা এই প্রসঙ্গ উত্থাপনের সুযোগও পেলেন না। অস্বচ্ছতার আরও একটি উদাহরণ— তহবিলে যে টাকা জমা রয়েছে, তা কোথা থেকে এসেছে, জনপরিসরে কখনও সে তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে, পিএম-কেয়ার্স তহবিল বিষয়ে দেশের মানুষ সম্পূর্ণ অন্ধকারে। জনস্বার্থে তৈরি হওয়া যে তহবিলের টাকাও খরচ হয় না আর যার তথ্যও পাওয়া যায় না, তার বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা নাগরিকের গণতান্ত্রিক কর্তব্য নয় কি?

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
PM CARES government funds

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy