পরিবর্তনের রাজ্যেও ডেঙ্গির হানা অ-পরিবর্তিতই রয়ে গেল। প্রতি বর্ষায় তার আগমনবার্তাটি ঘোষিত হয়। এ বছরও তার অন্যথা হয়নি। যদিও সরকারি তথ্য মতে, এখনও অবধি ডেঙ্গিতে আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম। কিন্তু নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় নেই। কারণ, পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, এই বছর ডেঙ্গি পরীক্ষার সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় কম। তা সত্ত্বেও ডেঙ্গির কারণে একাধিক মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যাও চার হাজার পেরিয়েছে। সাধারণত, শীত শুরুর পূর্ব পর্যন্ত এই রোগটি রাজ্যের নানা প্রান্ত দাপিয়ে বেড়ায়। সেই হিসাবে, ডেঙ্গির প্রকোপ তুঙ্গে ওঠার মুহূর্তগুলি এখনও বাকি। তদুপরি, এল নিনিয়োর প্রভাবে যদি রাজ্যে শীত আসতে দেরি হয়, যে সম্ভাবনার কথা বহু বিশেষজ্ঞই জানিয়েছেন, তবে ডেঙ্গি মরসুমটি আরও প্রলম্বিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আক্রান্ত, মৃতের সংখ্যায় লক্ষণীয় বৃদ্ধির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কলকাতার বেশ কিছু এলাকায় তার ইঙ্গিতও মিলেছে।
রোগ হিসাবে ডেঙ্গির চরিত্রটি বিপজ্জনক। সুতরাং, এই রোগ মোকাবিলার কাজটি মরসুমভিত্তিক হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়, বরং সারা বছর সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি পালন এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্নের উপরেই সাফল্যের হার নির্ভর করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছরই সেই কাজে ফাঁকি দেখা যায়, ফলে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হারকে একেবারে নামিয়ে আনা সম্ভব হয় না। এই বছর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিকদের আশ্বস্ত করেছেন। প্রশাসনিক বৈঠকে আগামী দিনের পরিকল্পনা বিষয়ে আলোকপাতও করা হয়েছে। এবং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ডেঙ্গি সংক্রান্ত তথ্য না লুকিয়ে প্রকাশ্যে আনার। প্রসঙ্গত, পূর্বতন রাজ্য প্রশাসন রোগ-তথ্য অনেকাংশে লুকিয়ে এই রোগ মোকাবিলার পথটিকে জটিলতর করে তুলেছিল। সেই ভয়ঙ্কর পথ থেকে, অন্তত মৌখিক ভাবে, সরে আসার প্রয়াসটি সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু শুধুমাত্র এতেই ডেঙ্গিকে থামানো যাবে না। খাস কলকাতার রাস্তাগুলির অবস্থা শোচনীয়, খানাখন্দে জল জমে তা মশার বংশবৃদ্ধির আদর্শ ক্ষেত্র হয়ে রয়েছে। এবং নির্বাচনোত্তর বঙ্গে পুরসভা ও পঞ্চায়েতের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এক বৃহৎ অংশই কার্যত বেপাত্তা হয়ে রয়েছেন। ডেঙ্গি মোকাবিলার কাজে এত কাল তাঁদের ভূমিকাটি উল্লেখযোগ্য ছিল।
সমস্যা আরও আছে। সম্প্রতি রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্মীদের বৃহদংশই ব্যস্ত ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর তথ্য সংক্রান্ত কাজে। ফলে, এত দিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে ডেঙ্গি পরিস্থিতির উপর নজর রাখার কাজটি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। জেলা পুরসভাগুলির অবস্থাও বিশেষ সুবিধার নয়। ডেঙ্গি আটকাতে ৪৩টি পুরসভায় বিশেষ সাফাই অভিযানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাফাইকর্মীদের দৈনিক মজুরি সেখানে মাত্র ১৯৭ টাকা ও ২৪০ টাকা। সেই সামান্য টাকাও পুরসভাগুলিতে কয়েক মাস ধরে হয় মিলছে না, নয়তো আংশিক মিলছে বলে অভিযোগ। চলছে ছাঁটাইও। ফলে, অসন্তোষ ক্রমে বাড়ছে। এমতাবস্থায় ডেঙ্গি মোকাবিলার কাজে গতি আনা কত দূর সম্ভব, সন্দেহ যথেষ্ট। শুধুমাত্র তেল-ব্লিচিং ছড়ানো আর জ্বরের রোগীর সন্ধান করাই নয়, ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগগুলিকে পূর্ণমাত্রায় সচল করতে হবে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গা-জোয়ারির কোনও জায়গা নেই।