E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

জঙ্গলবিলাস

বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের অবস্থানটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে বিশ্বের সর্বাধিক বিপন্ন এলাকার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে সুন্দরবন। সেখানে বিপদ বহুমাত্রিক। একের পর এক শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড়ে তছনছ হয়েছে এই অঞ্চল, বাঁধ ভেঙেছে, বহু দ্বীপের জমি তলিয়ে গিয়েছে।

শেষ আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:১১

নির্জন দ্বীপে কাঠের পাঁচতারা হোটেল। সঙ্গে থাকবে বাঘ ও ডলফিন সাফারির সুযোগও। পরিকল্পনা চলছে, হোটেল পরিচালনার কাজে স্থানীয় বাসিন্দাদের ৭০-৮০ শতাংশকে নিয়োগেরও। বিজেপি নেতা তথা অভিনেতার কণ্ঠে এ-হেন প্রকল্পের কথা শুনলে ভ্রমণবিলাসীদের উৎফুল্ল হওয়া উচিত। স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটার সম্ভাবনায় রাজ্যবাসীরও আশ্বস্ত হওয়ার কথা। কিন্তু তার পরিবর্তে গভীর উদ্বেগ জন্ম নিচ্ছে। কারণ— জায়গাটি সুন্দরবন। জল-জমির সমৃদ্ধ জীববৈচিত্রের কারণে আন্তর্জাতিক ভাবে যা সমাদৃত। সুন্দরবনের প্রকৃতি অন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলির মতো নয়। এর উন্নয়নকার্যে হাত দিতে হলে সর্বাগ্রে তার অতি সংবেদনশীল ভূপ্রকৃতিকে বোঝা প্রয়োজন। বাদাবনের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র বিষয়ে যথাযথ জ্ঞানলাভ না করে পর্যটনকেন্দ্রিক বিকাশের রূপরেখা প্রস্তুত করা, এবং ‘উন্নয়ন’-এর নামে কিছু সঙ্কীর্ণ মুনাফাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ সমগ্র অঞ্চলের পক্ষে বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের অবস্থানটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে বিশ্বের সর্বাধিক বিপন্ন এলাকার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে সুন্দরবন। সেখানে বিপদ বহুমাত্রিক। একের পর এক শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড়ে তছনছ হয়েছে এই অঞ্চল, বাঁধ ভেঙেছে, বহু দ্বীপের জমি তলিয়ে গিয়েছে। প্রবল ক্ষতি হয়েছে কলকাতা-সহ বাকি রাজ্যকে রক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্যেরও। গবেষকরা জানিয়েছেন, পরিবর্তিত নদীপথ, সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি, জমি-জলে লবণের মাত্রা বৃদ্ধি, মিষ্টি জলের ভান্ডারে টান পড়া প্রভৃতি নানাবিধ কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ ক্রমশ নষ্ট হতে বসেছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে বেআইনি ভাবে সরকারি জমি দখল এবং মাছ চাষের জন্য ভেড়ি তৈরির অপচেষ্টা, পর্যটনের নামে কংক্রিটের আগ্রাসন এবং প্লাস্টিক দূষণের বাড়বাড়ন্ত। সব মিলিয়ে সুন্দরবন তার ধারণক্ষমতার শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে। এই সময় যে কোনও কাণ্ডজ্ঞানহীন পদক্ষেপ ধ্বংস প্রক্রিয়াটিকে দ্রুততর করবে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সুন্দরবনেরই মাটিতে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব বলেছিলেন, সুন্দরবনে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও রাজ্য সরকার পরিকাঠামো উন্নয়নে তৎপর নয়। সাম্প্রতিক কালে রাজ্য সরকারের সুন্দরবন বিষয়ে একাধিক পদক্ষেপের ইঙ্গিতের মধ্যে সেই ‘সম্ভাবনা’ প্রসঙ্গেরই ছায়া দেখা যায়। নিঃসন্দেহে, সুন্দরবনে বিকল্প জীবিকার অভাব তীব্র। অধিকাংশ মানুষই নদী-জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল, নয়তো পরিযায়ী জীবন বেছে নিয়েছেন। কিন্তু তার সমাধান শুধুমাত্র পাঁচতারা হোটেল ও বিনোদনমূলক প্রকল্প হতে পারে না। বাম আমলেও এই চেষ্টা হয়েছিল, যা আটকে যায় পরিবেশবিদদের তীব্র প্রতিবাদ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের বাধাদানে। ছাড়পত্র দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকারও। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ভারত জুড়ে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে পাহাড়, জঙ্গল কাটা পড়ছে, কাজিরাঙার মতো জাতীয় উদ্যানের চার পাশের ভূপ্রকৃতিগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকা নির্মম ভাবে ছেঁটে ছোট করে দেওয়ার ঘোষণা হচ্ছে, কূটনৈতিক সুবিধার স্বার্থে বৃষ্টিঅরণ্যের জনজাতি সম্প্রদায়ের জীবন বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে। নিশ্চিন্ত আর থাকা যাচ্ছে না।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Sundarbans West Bengal government West Bengal tourism Department west bengal tourism Environmental awareness

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy