মহারাষ্ট্রে শিবসেনার এক পুরপ্রতিনিধিকে জামিন দিয়েছিল বম্বে হাই কোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় নাকচ করে জানাল, আত্মসমর্পণ করতে হবে রমেশ মাত্রে নামক সেই পুরপ্রতনিধিকে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এক মহিলা ডাক্তারকে শারীরিক ভাবে নিগ্রহের। গোটা ঘটনাটির ভিডিয়ো রেকর্ডিং রয়েছে, ফলে অপরাধ অস্বীকার করার কোনও উপায় মাত্রের নেই। শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ জানিয়েছে, এ কথা স্পষ্ট ও জোরালো ভাবে বলা প্রয়োজন যে, কোনও পরিস্থিতিতেই চিকিৎসকদের গায়ে হাত তোলা যাবে না। তাঁরা জনসাধারণের সেবা করেন, ফলে তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। আদালতের এই কঠোর অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে বলা প্রয়োজন, শুধু চিকিৎসকরাই নন, বিভিন্ন জনমুখী পেশায় নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিরই এই সুরক্ষা প্রয়োজন। চিকিৎসক, শিক্ষক থেকে সাংবাদিক, পেশাগত নিরাপত্তা প্রত্যেকের অধিকার, এবং সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। পরিষেবা নিয়ে যতই ক্ষোভ থাকুক, কোনও সভ্য দেশে এ ভাবে কারও উপরে চড়াও হওয়া সম্পূর্ণ অসহনীয়। এমন আচরণের প্রতি বিন্দুমাত্র শিথিলতাও প্রদর্শন করা চলে না। যারা পেশাদারদের উপরে চড়াও হবে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশ-প্রশাসনের কর্তব্য; অপরাধী সাব্যস্ত হলে তাদের কঠোর শাস্তি প্রাপ্য।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভের যে যথেষ্ট কারণ আছে, সে কথা কোনও ভাবেই অস্বীকার করা যায় না। বিশেষত স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো ক্ষেত্রে, যেখানে কর্মীর অপ্রতুলতাই কার্যত নিয়ম হয়ে উঠেছে, ফলে অতি জরুরি পরিষেবার জন্যও মানুষকে দীর্ঘ ক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয়। এ কথাও স্বীকার করা জরুরি যে, পরিষেবা ব্যাহত, বিলম্বিত বা তুলনায় নিম্নমানের হওয়ার আসল দায় কার, বা কোথায় কোথায় কাঠামোগত খামতি থেকে যাওয়ার কারণে পরিষেবার গুণগত মান ব্যাহত হচ্ছে, তা বোঝার দায় মানুষের উপরে চাপানো চলে না। এই খামতি দূর করা, এবং কোথাও কোনও অনপনেয় সমস্যা থাকলে সে কথা স্পষ্ট ভাবে জানানো প্রশাসনের কর্তব্য। প্রশাসন সে কাজ করে না, ফলে যাঁরা প্রত্যক্ষ ভাবে পরিষেবা দিচ্ছেন, মানুষের ক্ষোভ তাঁদের উপরেই এসে পড়ে। মনে হয়, তাঁরা ইচ্ছা করে পরিষেবায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছেন। এই ক্ষোভ জমতে জমতে এক সময় তার বিস্ফোরণ ঘটে। কেউ সন্দেহ করতেই পারেন, জনগণের ক্ষোভ যাতে প্রকৃতার্থে দায়ীদের দিকে ধাবিত না হয়, সেই কারণেই এহেন অস্বচ্ছতা বজায় থাকে। প্রশাসনকে তার প্রাথমিক কর্তব্যটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন— যাঁরা প্রত্যক্ষ ভাবে পরিষেবা দিচ্ছেন, বিন্দুমাত্র শৈথিল্য ব্যতিরেকে তাঁদের নিরাপত্তা রক্ষা করা। তার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তার বর্ধিত ব্যবস্থা, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি— যে যে ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা-ই করতে হবে।
তবে একই সঙ্গে একটি অন্য কথাও মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন— সাধারণ মানুষ রেগে যান, অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু সেই ক্ষোভে অগ্নিসংযোগ করার কাজটি সচরাচর রমেশ মাত্রের মতো লোকেরাই করে থাকেন। এই ক্ষোভ শেষ অবধি বিশৃঙ্খলা বা আইনভঙ্গে পরিণত হলে যাঁদের লাভ, তেমন লোক। ভারতের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এমন লোকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত— অনেক ক্ষুব্ধ মানুষকে নেতৃত্ব দিয়ে একটা বড় মাপের ঝামেলা পাকাতে পারলে দলীয় সিঁড়িতে যাঁদের পক্ষে এক লাফে বেশ কয়েক ধাপ উঠে যাওয়া সম্ভব। মানুষের ক্ষোভ তাঁদের কাছে পড়ে পাওয়া পুঁজি— এই নেতাদের প্রকৃত প্রতিভা সেই ক্ষোভকে নিজেদের স্বার্থের অভিমুখে যথাসাধ্য ব্যবহার করায়। অতএব, এ-হেন লোকেদের প্রতি কঠোরতর হওয়াই বিধেয়। শীর্ষ আদালত সেই কঠোরতার কথাই বলেছে। প্রশ্ন হল, আদালতের বার্তা কি পুলিশের রাজনৈতিক আনুগত্যের কু-অভ্যাস দূর করতে পারবে?