এই মুহূর্তে এই দেশে মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিক চাপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক গভীর উদ্বেগ ও সংশয়ের সৃষ্টি করেছে— নানা দিক থেকে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক-এর সাম্প্রতিক সুদের হার বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক ভাবে কঠোরতর আর্থিক নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্তের সূত্রে লক্ষণীয়, মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি এখন আর কেবল দু’-একটি নির্দিষ্ট পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এক দিকে জলবায়ুগত কারণে কৃষি ব্যাহত হয়েছে, ফলে চাল, ডাল, আনাজ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে। অন্য দিকে, পেট্রল-ডিজ়েলের মূল্যবৃদ্ধি দেশীয় অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে ব্যাপক ও গভীর ভাবে প্রভাবিত করছে। পরিবহণের বাড়তি খরচের কারণে কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে শিল্পপণ্য— সব কিছুর খরচই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আমদানির খরচও বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সমীক্ষায় স্পষ্ট, বাজারে বহু পণ্যের দরই চলে গিয়েছে সাধারণ সীমার উপরে। অর্থনৈতিক ভাবে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলির মধ্যে কেবল চাপ তৈরি হয়নি, ভবিষ্যৎ নিয়েও তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের মাসের বাজেটে টান পড়ছে, দৈনিক জীবনযাত্রার মান কমছে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে দেশের বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্যে বোঝা গেল যে সরকারি মহলেও দেশের খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থব্যবস্থায় বিশ্বব্যাপী সঙ্কটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বিরাট।
ভারতীয় অর্থব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য দীর্ঘ দিন ধরেই টালমাটাল। কর্মসংস্থান শ্লথ, বাজারে চাহিদা দুর্বল, বিনিয়োগও গতিহীন। তার উপরে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক সঙ্কট। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার ফলে দেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে উল্লেখজনক ভাবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দাম এবং জলবায়ুগত পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ‘এল নিনিয়ো’ দুর্যোগের সম্ভাবনা আশঙ্কাজনক রকম জোরালো হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের রবি শস্যের কৃষি উৎপাদনে। কৃষিপণ্যের জোগানে টান পড়লে বাজারে খাদ্যসামগ্রীর দাম অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বেড়ে যায়— অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব’। এতে প্রথম দফার জোগানজনিত ঘাটতি ক্রমে এক দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে বাজারে অন্যান্য যাবতীয় পরিষেবা ও পণ্য তৈরির খরচ স্থায়ী ভাবে বাড়িয়ে দেয়।
মূল্যবৃদ্ধির এই বহুমুখী ধাক্কা নিয়ে সরকার নিশ্চয়ই অবহিত, কিন্তু তা সামলানোর প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা হচ্ছে কি? আপাতভাবে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির তফাত লক্ষণীয়। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের কমিটির কিছু সদস্যের মতে, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি প্রধানত বৈশ্বিক ও জোগানজনিত সমস্যার ফল, তাই সুদের হার অতিরিক্ত বাড়ালে দেশের নতুন বিনিয়োগ ও সার্বিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি থমকে যেতে পারে। অন্য দিকে, বহু অর্থনীতিবিদের মত, সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ না করলে বাজারের উপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থা নষ্ট হবে, মানুষের সঞ্চয়কে তা ব্যাহত করবে। সুতরাং, দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের পকেটের স্বস্তি ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে সুচিন্তিত সুদের নীতি প্রয়োগ করতে হবে, সরকারকে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সময়োপযোগী প্রশাসনিক পদক্ষেপ করতে হবে।