বর্তমানে গোটা দেশ জুড়ে এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া বারংবার যে বিস্ময় ও চমক তৈরি করছে, তার তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষত্ব কতখানি, আর পশ্চিমবঙ্গের প্রক্রিয়া সংসাধনের বিশেষত্ব কতখানি, তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। তবে শেষতম চমক এনে দিল সুপ্রিম কোর্টে আনীত অভিযোগ। এই অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের ভিত্তিতে উঠে এল— যাতে জানা গেল যে, রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে আরও ৩১ লক্ষ নাম বাদ দিতে ট্রাইবুনালের কাছে আবেদন পেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমত এসআইআর ট্রাইবুনালের কার্যধারা যদিও নির্বাচনের পর কম আলোচিত হচ্ছে, কিন্তু ইতিমধ্যে তার কাছে জমা পড়েছে ৩৮ লক্ষ ১০ হাজার আবেদন। এর মধ্যে বিবেচনাধীন ২৭ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৭ লক্ষ নাম আবার যোগের আবেদন জমা পড়েছে। বাকি ৩১ লক্ষাধিক আবেদন— উপস্থিত ভোটার তালিকা থেকে এই সংখ্যাকে বাদ দেওয়ার লক্ষ্যে জমা পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যৌক্তিক বা তথ্যগত অসঙ্গতির কোপে পড়েছিলেন ৬০ লক্ষের বেশি মানুষ, বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩২ লক্ষ ৬৮ হাজার যোগ্য ভোটার হিসাবে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ছাড়পত্র পেয়েছিলেন। প্রশ্ন হল, এই ৩২ লক্ষের মধ্যেই ৩১ লক্ষাধিক নামকে যদি আবার নতুন করে বাদ দেওয়ার আবেদন জমা পড়ে থাকে— তা হলে বিচারবিভাগীয় এই প্রক্রিয়াটির প্রয়োজন কী ছিল? তা ছাড়া, কেন এত গুরুতর একটি তথ্য এত দিন স্পষ্ট হয়নি? কমিশনের কি উচিত ছিল না, এই তথ্য নিজের থেকে জনসমক্ষে আনা? বিষয়টির গুরুত্ব কি তাদের বোধের অগম্য?
প্রশ্ন নিরর্থক। এসআইআর পর্বের অনেক ঘটনাই ব্যাখ্যাহীন, এই সব প্রশ্নও থাকবে উত্তরহীন। তবু, উত্তর আসবে না জেনেও প্রশ্নগুলি তোলা অতীব জরুরি। ২৭ লক্ষের মধ্যে যে ৭ লক্ষ বিবেচনাধীন ভোটার আবারও আবেদন করেছেন, তাঁদের মধ্যে ৮২ হাজার ৭৮২টি আবেদন ট্রাইবুনাল পরীক্ষা করে ৭৫,৪৪৩টি আবেদনের ক্ষেত্রে ভোটার-ত্ব আবার ফিরিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ট্রাইবুনালে যাওয়া ৯১ শতাংশ আবেদনই ভোটার-ত্ব প্রমাণে সফল। সে ক্ষেত্রে যাঁদের আবেদন এখনও অপরীক্ষিত, তাঁদেরও ফেরার সম্ভাবনা কম নয়। যে কুড়ি লক্ষ আবেদন করেননি, বা করতে পারেননি— তাঁদের ‘সম্ভাবনা’র কথাও এ প্রসঙ্গে ভাবা যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সকল মানুষ এক সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিবেশ থেকে আসেন না। তাঁরা সকলেই এই অতি জটিল প্রক্রিয়ার দ্বারস্থ হতে সমর্থ নন, বার বার দ্বারস্থ হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি ও আর্থিক সঙ্গতিও রাখেন না। তাঁদের এই অপ্রস্তুতির সুযোগ নিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্র তাঁদের ভোটার পরিচয় কেড়ে নিতে চায় কি না, এই প্রশ্ন কেবল নির্বাচন কমিশনের কাছে নয়, কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগের কাছেও করা দরকার। তা ছাড়া, যে মানুষগুলি বিনা দোষে এ বার বিধানসভা ভোটে ভোট দিতে পারলেন না, কিন্তু ভোটের পর যাঁদের ভোটার পরিচয় ফিরে আসছে এবং আসবে, তাঁদের জন্য ভারতীয় গণতন্ত্র নিজেকে দায়ী এবং দোষী মনে করছে কি না, সেও এক বিস্ময়সূচক প্রশ্ন!
এসআইআর-এ যাঁদের নাম বিচারাধীন, তাঁদের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রকল্পের সুযোগসুবিধা প্রযোজ্য কি না, এ নিয়েও বিস্তর তর্কবিতর্ক শোনা যাচ্ছে। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও যে এই সুযোগসুবিধা তাঁরা পাবেন, এমন আশা এখনও ক্ষীণ। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর: রাজ্য সরকারের দায়িত্ব এই মানুষগুলি যাতে বঞ্চিত না হন, সেটা দেখা। এ দিকে শোনা যাচ্ছে, ভোটার তালিকা থেকে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁরা এখন শিশুদের স্কুলে পাঠাতেও অপারগ। অথচ এসআইআর প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্ব বিচারের সরাসরি সম্পর্ক নেই, এমন ঘোষণা একাধিক বার শোনা গিয়েছে। এ নিয়েও প্রশ্ন তুলতেই হবে। উত্তর মিলবে না, এই আশঙ্কা নিয়েও।