শিরোনামে আবার কাশ্মীর হিংসা, পহেলগাম-এর পর প্রথম বার। এক জন পুলিশকর্মী নিহত হলেন অস্ত্রধারী জঙ্গির হাতে। ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে গত বুধবার, অনন্তনাগ শহরে। এবং ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই নিয়মিত ও পরিচিত কাজে ফিরে গিয়েছে সে রাজ্যের পুলিশ বাহিনী, গোটা এলাকা আলাদা করে ঘিরে দেওয়া থেকে শুরু করে তদন্ত এবং গ্রেফতারের পালা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রায় ২৫০০ স্থানীয় মানুষ গ্রেফতার। এবং তা নিয়ে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভও বর্ধমান। সন্দেহ নেই, জঙ্গি হানা নিয়ে প্রশাসনকে কড়া হতেই হবে, তবে সেই কাজে নেমে যথোপযুক্ত তদন্তের আগেই সন্দেহের ভিত্তিতে এত জন মানুষকে ধরার সিদ্ধান্তটি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাও। জঙ্গি হানা ঘটার পর প্রশাসনের তরফে এই ধরনের কার্যপদ্ধতিতে কাশ্মীরি সমাজে আরও বড় ক্ষত তৈরি হতে থাকে: দশকের পর দশক ধরে সেই ট্র্যাডিশনই চলেছে।
প্রশ্ন হল, আবারও কী করে এই পুলিশ নিধন ঘটতে পারল। নিরাপত্তা বাহিনীর চাদরে মোড়া উপত্যকায় স্বাভাবিক চলাচল করাই যেখানে কঠিন, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার কেন রোধ করা যাচ্ছে না। সন্দেহ হয়, নিয়মিত সতর্কতা রক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যর্থতা থেকে যায়, এবং সেই প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গি কিংবা সন্ত্রাসপন্থায় বিশ্বাসী বাসিন্দাদের পক্ষে অস্ত্র ব্যবহার সহজ হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পহেলগামের ভয়ঙ্কর ঘটনাতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, প্রশাসনের দুর্বলতা কত দূর যেতে পারে। তার পর গত এক বছরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে যে বিপুল ও গভীর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে কাশ্মীরের প্রশাসন অনেক বেশি সতর্ক ছিল। প্রসঙ্গত, জঙ্গি আক্রমণ না হলেও জঙ্গি দমনের সূত্রে প্রচুর প্রাণনাশ হয়েছে গত এক বছরে। ‘সাউথ এশিয়া টেররিজ়ম পোর্টাল’-এর মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, পহেলগামের পর অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে হত্যা-নিধনের ঘটনা তুলনামূলক ভাবে কম ছিল। এই সময়ে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট মোট ১২টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১০ জন ছিল জঙ্গি। এদের অধিকাংশই পাকিস্তান থেকে নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) অতিক্রম করে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় নিহত হয়। উল্লেখযোগ্য ভাবে, মে মাস— যে সময় পাহাড়ি গিরিপথ খুলে যাওয়ার পর সাধারণত জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পায়— এ বছর একটিও সন্ত্রাসী হামলা ঘটেনি।
লক্ষণীয়, কাশ্মীর উপত্যকায় হিংসা কমলেও, জঙ্গি তৎপরতার ভৌগোলিক কেন্দ্র ধীরে ধীরে জম্মু অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। অনুমান— ৩৭০ ধারা বিলোপের পর উপত্যকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হওয়ায় জঙ্গি সংগঠনগুলি তাদের কার্যক্রম পরিচালনার কৌশলে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৫ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে সংঘটিত মোট জঙ্গি-হানার ৬০ শতাংশেরও বেশি ঘটনা জম্মু বিভাগে নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে আগে এই হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরে নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নটি আগের চেয়ে সহজ হয়নি তো বটেই, জঙ্গি কার্যক্রমে বেশ কিছু পরিবর্তনের ফলে কঠিনতর হয়ে উঠছে। প্রশাসনিক মোকাবিলার দক্ষতা বাড়ানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।