E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

দুর্লক্ষণ

শাসকের তরফে বিরোধীদের প্রতি দমনেচ্ছার সঙ্গে বিজেপি আমলের আগেও পশ্চিমবঙ্গ হাড়ে হাড়ে পরিচিত। তা সত্ত্বেও গত চার-পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতার কিছু বিশেষত্ব আছে।

শেষ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:১২

গত রবিবার কলকাতার একটি বিদ্যাচর্চা ক্ষেত্রে যে হিংসাকাণ্ড দেখা গেল, তাকে এখন আর অপ্রত্যাশিত বলা চলে না। এত দিনে গ্রীষ্মরৌদ্রের মতো প্রখর যে, নতুন পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীদের সঙ্গে শাসকপন্থীদের সংঘাত নিত্য দিনের বাস্তব, এবং সেই সংঘাত শারীরিক আক্রমণ পর্যন্ত যেতে পারে। বিধানসভায় বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত গুন্ডা দমন বিল শেষ অবধি তার প্রয়োজনীয় সম্মতি-স্বাক্ষর পায়নি ঠিকই, কিন্তু সেই বিল ছাড়াই বিরোধী মতের মানুষজনের উপর এন্তার দমনপীড়ন চলছে। শাসকপন্থী প্রহারবাহিনী পুলিশের চোখের সামনেই, এমনকি পুলিশের সহযোগিতায়, আক্রমণ চালাচ্ছে— যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটেও। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রতিটি ঘটনাতে বাঁধা সুরে বক্তব্য পেশ করেছেন, বলেছেন— না, বিরোধীশূন্য অবস্থা গণতন্ত্রের পক্ষে মোটেই সুখকর নয়। তাঁর কথায় কেউ হাসছেন, কেউ বিরক্ত হচ্ছেন, ও-দিকে শাসক পক্ষ ভারসাম্য রক্ষার খেলায় জিতে চলেছে। বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের শারীরিক ভাবে হেনস্থা করা, ‘ডিম থেরাপি’ চালানো, এমনকি ভিন্ন মতের কারণে প্রবীণ শিক্ষককে হেনস্থা— এমন বহু ঘটনা ঘটে চলেছে। রবিবারও তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের উপর প্রকাশ্যত শারীরিক আক্রমণ ধাবিত হতে দেখা গেল। শমীকবাবু যা-ই বলুন, এই রাজ্যে বিরোধী শিবিরের কোনও গুরুত্বই শাসক দলের কাছে নেই। এই নিরাপত্তাহীন, নিয়মিত উপদ্রবের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ কী ভাবে শান্তি, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের রাস্তায় সাক্ষাৎ হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা হয়ে উঠবে, ভেবে হতাশাভিভূত হতে হয়।

শাসকের তরফে বিরোধীদের প্রতি দমনেচ্ছার সঙ্গে বিজেপি আমলের আগেও পশ্চিমবঙ্গ হাড়ে হাড়ে পরিচিত। তা সত্ত্বেও গত চার-পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতার কিছু বিশেষত্ব আছে। কোনও বিবেচনা ছাড়াই সীমান্ত পার করে মানুষকে বিদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব, উপনির্বাচন স্থির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরাতন মামলার প্রসঙ্গ তুলে বিরোধী প্রার্থীকে গ্রেফতার— এ সব কোনও সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন নয়। রাজ্যে একের পর এক কাঠামোগত পরিবর্তন হয়ে চলেছে, আইনসভায় সে সব প্রসঙ্গে আলোচনার যথেষ্ট অবকাশ না রেখেই। ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে পারলেও যে গণতান্ত্রিক পরিসরে আলোচনার পথ বন্ধ করে দেওয়া চলে না, রাজ্যের নতুন শাসকরা অতি দ্রুত সে কথা বিস্মৃত হয়েছেন।

আলোচনার অবকাশ যে বিনষ্টপ্রায়, তাতে বিরোধীদের দায়িত্বও কম নয়। এবং সে বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। লক্ষ করা জরুরি যে, বিধানসভার পরিসরে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক সংখ্যা যথেষ্ট— অন্তত, সরকারের কাছে জবাব চাওয়ার, বিভিন্ন প্রশ্নে আলোচনা দাবি করার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু, এসআইআর-এ নাম না-ওঠা নাগরিকদের ক্যাম্পে পাঠানোর ক্ষেত্রেই হোক, অন্নপূর্ণা প্রকল্প থেকে অকারণ নাম বাদ পড়ার প্রসঙ্গেই হোক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারের হাতে শিক্ষক বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়াই হোক, কিংবা হকার উচ্ছেদ— সব প্রশ্নেই স্পষ্ট যে, এই গোত্রের বিধায়করা ‘শাসকপোষিত বিরোধী’ হিসাবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে উদ্গ্রীব। দলের নাম অথবা প্রতীকের মালিকানা আদায়ের জন্য তাঁদের ব্যাকুলতার অংশমাত্র যদি সত্যিই বিরোধী রাজনীতির কর্তব্যপালনে দেখা যেত, রাজ্য রাজনীতির গতিপথ সামান্য হলেও পাল্টাত। অন্য দিকে, এখনও পর্যন্ত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জনসংযোগে বিস্ময়কর রকমের পরাঙ্মুখ। কংগ্রেস ও সিপিএম কিছুটা চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখনও শক্তির নিরিখে যথেষ্ট পিছিয়ে। বিশেষত সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও আশঙ্কার বিষয়গুলি নিয়ে তাঁদের কার্যকারিতা এখনও স্বল্প। সব মিলিয়ে, বিরোধিতার এই ন্যূনতা রাজ্যের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে এক গভীর দুর্লক্ষণ।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
SRFTI RSS Students Unrest Situation

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy