E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নতুন সুযোগ

ধু স্বাস্থ্যবিমার ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, রাজ্যের সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে তার সুবিধা যাতে সকলে সমান ভাবে পান, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড থাকা সত্ত্বেও রোগীকে চিকিৎসা না করে ফিরিয়ে দেওয়া, বা নগদ চাওয়ার বহু অভিযোগ ইতিপূর্বে উঠেছিল।

শেষ আপডেট: ০১ অগস্ট ২০২৬ ০৬:২১

রাজনৈতিক পালাবদলের পরেই কেন্দ্রীয় সরকারের ‘আয়ুষ্মান ভারত যোজনা’র আওতায় এসেছিল পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু ইতিপূর্বে প্রচলিত স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়েও ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এ যুক্ত হওয়ার শর্তগুলি পূরণ করতে পারেননি রাজ্যের বড় সংখ্যক মানুষ। প্রশ্ন উঠেছিল, তাঁরা কি তবে সরকারি স্বাস্থ্যবিমার বাইরেই থেকে যাবেন? উদ্বেগ অনর্থক নয়। এক দিকে ক্রমবর্ধমান চিকিৎসার খরচ, অন্য দিকে বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমার ক্রমশ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া— দুইয়ের ফাঁস থেকে খানিক স্বস্তির আশ্বাস দিয়েছিল সরকারি স্বাস্থ্যবিমা। তৃণমূল সরকারের আমলে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ জনপ্রিয় হয়েছিল এই কারণেই। গত বছরের শেষার্ধে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছেন সাড়ে আট কোটির বেশি মানুষ। কিন্তু তাঁদের সকলেই পরবর্তী কালে আয়ুষ্মান ভারত যোজনা-য় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। এই ফাঁকটি পূরণ করার উদ্দেশ্যেই সম্প্রতি বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নগদহীন সুবিধাযুক্ত ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা’ চালু করার কথা ঘোষণা করেছে সরকার। আয়ুষ্মান ভারত-এর মতোই এতেও বিমার সুবিধা মিলবে দেশের সর্বত্র। কোন রোগের চিকিৎসা হবে, কোন হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যাবে, কোন রোগের ক্ষেত্রে কী ধরনের খরচ পাওয়া যাবে— সমস্তই আয়ুষ্মান ভারত যোজনা-র নির্দেশিকা অনুযায়ী মিলবে। অর্থাৎ, ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর পরিপূরক হিসাবেই কাজ করবে ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা’।

তবে, এই ক্ষেত্রটিও শর্তাধীন, যার মধ্যে অন্যতম পারিবারিক আয়ের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া। স্বাস্থ্যসাথী ছিল সর্বজনীন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা-র ক্ষেত্রে বার্ষিক পারিবারিক আয় আট লক্ষ টাকার অধিক হলে, তাঁরা এই বিমার সুবিধা পাবেন না। আরও একটি পার্থক্য উল্লেখযোগ্য— নারীর ক্ষমতায়ন। স্বাস্থ্যসাথী-তে রাজ্যের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ দফতরের পক্ষ থেকে পরিবার-পিছু এক জনের নামে একটি করে হেলথ কার্ড দেওয়া হত। পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক মহিলা সদস্যের নামে থাকত কার্ডটি। সুবিধা পেতেন অন্য সদস্যরা। উদ্দেশ্যটি গভীর। ভারতের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে চিরকালই মেয়েদের স্বাস্থ্যের প্রশ্নটি নিদারুণ উপেক্ষিত। তাঁদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারের আগে সাজিয়ে রাখা হয় পরিবারের প্রতি ‘কর্তব্য’-এর ধারণাগুলি। পুরুষ পরিবারের কর্তা, রোজগেরে, সুতরাং তাঁর স্বাস্থ্যসুরক্ষার প্রয়োজনটি সর্বাধিক— এই ধারণা থেকে এখনও ভারতীয় সমাজের এক বৃহৎ অংশই বেরোতে পারেনি। ফলে মেয়েদের ক্ষেত্রে রোগ লুকিয়ে রাখা, চিকিৎসা-পরবর্তী যত্নে অবহেলা, নিয়মিত ওষুধ না খাওয়া স্বাভাবিক চিত্র। স্বাস্থ্যসাথী এই অন্ধকার জায়গাতেই মোক্ষম আঘাত করেছিল পরিবারের মেয়েদের নামে স্বাস্থ্যকার্ডটি করে। এর প্রতীকী মূল্য অসাধারণ। এখনও অবধি জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা প্রকল্প পরিবারভিত্তিক হলেও প্রত্যেক সদস্যের নামে আলাদা কার্ড হবে। ইতিবাচক চিন্তা, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে নারীর ক্ষমতায়ন বা নারীকেন্দ্রিক ভাবনাটি, এখনও, লক্ষণীয় ভাবে অনুপস্থিত।

তা ছাড়া শুধু স্বাস্থ্যবিমার ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, রাজ্যের সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে তার সুবিধা যাতে সকলে সমান ভাবে পান, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড থাকা সত্ত্বেও রোগীকে চিকিৎসা না করে ফিরিয়ে দেওয়া, বা নগদ চাওয়ার বহু অভিযোগ ইতিপূর্বে উঠেছিল। দরিদ্রদের জন্য নিখরচায় বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরীক্ষার সুযোগ, স্বল্পমূল্যের সরকারি ওষুধের দোকানগুলিতে ওষুধের সরবরাহ এবং গুণমান নিশ্চিত করা প্রভৃতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সাধারণ মানুষের এক বৃহৎ অংশ এখনও সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার উপরেই আস্থাশীল। স্বাস্থ্যবিমা তার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অন্য বিষয়গুলিতেও আমূল সংস্কার জরুরি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Ayushman Bharat Yojana Government Schemes

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy