E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

যন্ত্রের দাসত্ব

প্রকৃতপক্ষে, সমস্যার মূলে একাগ্রতা, মনোযোগ বিনষ্ট। কোনও কিছুকে স্মৃতিতে পরিণত করতে পর্যাপ্ত, নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ অর্পণ আবশ্যিক। অথচ ফোনের নোটিফিকেশন, সমাজমাধ্যম ও ভিডিয়ো-রিল ইত্যাদিতে আসক্তি এবং যে কোনও কাজের মধ্যে বারে বারে ফোনের দিকে তাকানোর অভ্যাস এই মনোযোগকে খণ্ড খণ্ড করে।

শেষ আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৩২

এক অতলান্ত ব্রহ্মাণ্ড বলা যায় স্মার্টফোনটিকে। সেটি একাধারে বাড়ির বারান্দা, টিভি, আড্ডা মঞ্চ, ব্যাঙ্ক, গ্রন্থাগার, সিনেমাহল, মনিহারি বিপণি। কিন্তু যন্ত্রের এই অপরিসীম শক্তি যে বিপুল সমস্যার সৃষ্টি করছে, তার একটি হল স্মৃতিহানির বিপদ। ফোন নম্বর, ঠিকানা, জন্মদিন, পথমানচিত্র, কাজের সূচি— মানুষ মনে রাখার দায়িত্ব যন্ত্রকে দিয়ে ভারমুক্ত হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়, এর নাম ‘কগনিটিভ অফলোডিং’, অর্থাৎ মস্তিষ্কের কাজ বাইরের কোনও সহায়কের উপর ন্যস্ত করা। কোনও তথ্য পরে সহজেই পাওয়া যাবে, এমন জানা থাকলে মস্তিষ্ক সেই তথ্যকে স্থায়ী ভাবে জমা রাখার কাজটি করতে চায় না, শক্তি সাশ্রয় করার চেষ্টা করে। অতঃপর, মানুষ প্রাত্যহিক জীবনকে সহজ করতে গিয়ে মস্তিষ্ককে অলস করে তুলছে। বিশেষত, প্রযুক্তি তথ্যভান্ডারের দায়িত্ব পালন করলে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে মানুষের স্মৃতির অভ্যাস।

প্রকৃতপক্ষে, সমস্যার মূলে একাগ্রতা, মনোযোগ বিনষ্ট। কোনও কিছুকে স্মৃতিতে পরিণত করতে পর্যাপ্ত, নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ অর্পণ আবশ্যিক। অথচ ফোনের নোটিফিকেশন, সমাজমাধ্যম ও ভিডিয়ো-রিল ইত্যাদিতে আসক্তি এবং যে কোনও কাজের মধ্যে বারে বারে ফোনের দিকে তাকানোর অভ্যাস এই মনোযোগকে খণ্ড খণ্ড করে। আগে নোটবুকে কোনও তথ্য লিখে রাখলেও সেটি মনে রাখার বা খুঁজে বার করার জন্য কিছুটা সময় ও পরিশ্রম করতে হত; এখন তা একটি ক্লিকেই হাজির। জিপিএসের সাহায্যে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যায়, কিন্তু পথটি নিজের মনে গেঁথে রাখার প্রয়োজন হয় না; ক্যালকুলেটর হিসাব কষে দেয়, তথ্যের সারি খুঁজে দেয় সার্চ ইঞ্জিন। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক ও স্মৃতির অনুশীলন ও বলবর্ধক নানা কাজ ধীরে ধীরে যন্ত্রের হাতে চলে যাচ্ছে। বিশেষত, ডিজিটাল দুনিয়ায় যারা চোখ মেলেছে, সেই শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কত ক্ষণ ডিজিটাল পর্দায় চোখ লাগিয়ে রয়েছে তার হিসাব রাখার পাশাপাশি নিজেরা মনে রাখছে কি না, চিন্তা করছে কি না, সমস্যার সমাধান করতে পারছে কি না— সে দিকেও লক্ষ রাখতে হবে; কারণ এই প্রবণতায় রাশ না টানলে তা মস্তিষ্কের বিকাশের অন্তরায় হতে পারে।

স্মার্টফোনকে শত্রু-জ্ঞানে বর্জন করা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত নয়, বরং এই সমস্যার সমাধান রয়েছে তার সঙ্গে সচেতন দূরত্বে। মানুষ বরাবরই প্রযুক্তি ও নানা বাহ্যিক সহায়কের সঙ্গে স্মৃতির দায়িত্ব ভাগ করেছে। নোটবুক ছাড়াও ডায়েরি লেখা, ক্যালেন্ডার রাখা, এমনকি পরিবারের সদস্যকে কিছু মনে করিয়ে দিতে অনুরোধ কারও তারই উদাহরণ। স্মার্টফোন সেই ব্যবস্থাকে সহজ ও সর্বব্যাপী করেছে। অধ্যয়ন বা গভীর মনোযোগের কোনও কাজের সময় ফোনটি চোখের আড়ালে রাখা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা, প্রযুক্তি হাতড়ানোর আগে নিজে থেকে পথ চেনার বা তথ্য মনে রাখার চেষ্টা প্রভৃতি দৈনন্দিন সুঅভ্যাসের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কাজ করার সুযোগ ও স্মরণ-ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ, স্মৃতি কোনও তথ্যভান্ডার মাত্র নয়, তা মানুষের অস্তিত্বের নির্মাতা, তার মনোজগৎ, বৌদ্ধিক ভুবনের ভিত্তি, পৃথিবী ও সম্পর্কের সৌন্দর্য অনুভবের এবং সম্ভাব্য বিপদ গণনার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রযুক্তি মেধা-বুদ্ধির অনুগত অশ্ব হোক, কিন্তু মগজধোলাই যন্ত্র যেন না হয়ে ওঠে— সেই সীমানা নির্ধারণের সময় বহু কাল সমাগত।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Memory Loss Technology Mobile Addiction

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy