E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কতখানি অধিকার

সে দিনের মিছিলের ঘটনায় পুলিশ দোষীদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চালু করেছে: সুসংবাদ। তবে, দোষীদের শাস্তি দেওয়ার নামে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অপচেষ্টা যেন না চলে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ ০৬:০৩

—প্রতীকী চিত্র।

মিছিলনগরী হিসাবে কলকাতার (কু)খ্যাতি অন্তত অর্ধশতকের। তার নেতিবাচক দিকগুলি বহুআলোচিত। কিন্তু, এ কথাও একই সঙ্গে অনস্বীকার্য যে, যুগের পর যুগ কলকাতার নাগরিক— বিশেষত শহরের তরুণ প্রজন্ম— পথে নেমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে, সেই অন্যায় বিশ্বের যে প্রান্তেই ঘটে থাকুক না কেন। সে দিক দিয়ে, দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা যুব-বিক্ষোভের সমর্থনে কলকাতার বিপুল মিছিল এক অর্থে শহরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করল। দেশজোড়া মিছিল-সমাবেশের মধ্যে একটি আলাদা স্থানও করে নিল, তার সুবিশালতার দৌলতে। তবে, ভারতের অন্য কোনও শহরে যা ঘটেনি, কলকাতা সেই লজ্জারও সাক্ষী রইল। মিছিলের একটি অংশ হয়ে উঠল হিংস্র, শারীরিক ভাবে আক্রমণ করল উপস্থিত পুলিশ ও সংবাদকর্মীদের। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রমাণ মিলেছে যে, মিছিলের একটি ছোট প্রক্ষিপ্ত অংশই এই বিশৃঙ্খলা ঘটিয়েছে। এমন সন্দেহেরও যথেষ্ট কারণ আছে যে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্যই তারা এই মিছিলে যোগ দিয়েছিল। তবে, মিছিলের আয়োজকদের এই বিশৃঙ্খলার দায়িত্ব নিতেই হবে, এবং সতর্ক হতে হবে। নাগরিক পরিসরে এমন বিশৃঙ্খলা কোনও মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষত কর্মরত সাংবাদিকদের উপর এই শারীরিক প্রহার— অত্যন্ত নিন্দনীয়।

প্রসঙ্গত, দিল্লির যন্তর মন্তরেও মূলধারার সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে। ফারাক হল, সেখানে ঘটনা শারীরিক হেনস্থায় পৌঁছয়নি। সভ্য নাগরিক পরিসরে কাউকেই হেনস্থা করা চলে না, প্রতিবাদের হরেক পথ রয়েছে। বিশেষত, আজকের সোশ্যাল মিডিয়া-অধ্যুষিত সময়ে নিজেদের বক্তব্য সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপায় বহুবিধ। এ সব ছাড়িয়ে যারা শারীরিক নিগ্রহের পথে যায়, কিংবা হুমকি দেয়— তারা যে কোনও রাজনৈতিক দলের ধ্বজাধারী হোক না কেন, সকলেই প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের শত্রু। লক্ষণীয়, সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গের পালাবদলের পর বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন মাত্রার শারীরিক নিগ্রহ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ককরোচ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রশাসন তা যত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, প্রতিটি ক্ষেত্রকেই সেই গুরুত্ব দেওয়া জরুরি— দলমতনির্বিশেষে।

সে দিনের মিছিলের ঘটনায় পুলিশ দোষীদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চালু করেছে: সুসংবাদ। তবে, দোষীদের শাস্তি দেওয়ার নামে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অপচেষ্টা যেন না চলে, তা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রশক্তির আচরণের প্রতিবাদ করা, শান্তিপূর্ণ ভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন ভারতে সংবিধানস্বীকৃত অধিকার। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টও আরশোলা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সেই অধিকারের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে, শীর্ষনেতার কুশপুত্তলিকা দাহ, অথবা ছবি নিয়ে বিক্ষোভও নিতান্ত প্রচলিত পদ্ধতি। বিক্ষোভ যত ক্ষণ না আইনভঙ্গ করছে, ছবি যত ক্ষণ কুৎসিত আক্রমণাত্মক বা প্রত্যক্ষত বিভেদ-উস্কানিমূলক না হয়ে উঠছে, তত ক্ষণ অবধি প্রতিবাদের পরিসরকে অবাধ রাখাও গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্য। সে দিক থেকে, রাজ্যের শাসকরা যে ভঙ্গিতে বিক্ষোভকারীদের মারার কথা বলছেন, তা অতি বিপজ্জনক। এমনকি, যারা আইন ভঙ্গ করছে, হিংসাত্মক তাণ্ডব চালিয়েছে, তাদেরও মেরে শাস্তি দেওয়ার অধিকার পুলিশের নেই। প্রয়োজনে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে আদালতে পেশ করুক— শাস্তিবিধানের দায়িত্বটি আদালতের উপরে ন্যস্ত থাকুক। গ্রেফতার হওয়া একাধিক অভিযুক্তকে পুলিশ হাফপ্যান্ট পরিয়ে খালি পায়ে হাঁটিয়েছে। ভারতীয় ন্যায়সংহিতার কোনও ধারা পুলিশকে এই অধিকার দেয় না। নাগরিক সমাজের আশা, মুখ্যমন্ত্রী এই প্রশাসনিক অরাজকতাকে প্রশ্রয় দেবেন না। আইনের শাসন সবার জন্যই প্রযোজ্য, এমনকি অভিযুক্তের বিচার ও অপরাধীর শাস্তিদানও আইনবিধি মেনেই হওয়া আবশ্যিক।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Law Bharatiya Nyay Sanhita Human Rights

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy