রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার ৮১তম অধিবেশনে ভারতীয় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক ভাষণ আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ভারতীয় নাবিকদের উপর ক্রমাগত হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়ে তিনি তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, লাইবেরিয়ার সঙ্গে যৌথ ভাবে ‘গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস অন সেফটি অ্যান্ড সিকিয়োরিটি অব শিপিং অ্যান্ড সিফেয়ারার্স’ গঠন করে আন্তর্জাতিক মহলে সমুদ্রযাত্রার সার্বিক নিরাপত্তার পক্ষেও জোরালো সওয়াল করেছে ভারত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত দিন পর্যন্ত যে ভারত পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে একপ্রকার ভারসাম্যমূলক নীরবতা বজায় রেখেছিল, হঠাৎ করে তার এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া কেন? এটি কি ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় একটি স্বাভাবিক পদক্ষেপ, না কি এর নেপথ্যে আমেরিকার শুল্ক চাপানোর ভয় এবং দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কা কাজ করছে?
বস্তুত, বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক ধাক্কাই ভারতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এতটা সরব করে তুলেছে। ওমান উপসাগর বা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে উপর্যুপরি হামলা এবং ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু কেবল কোনও দূরবর্তী সঙ্কট নয়— এটি সরাসরি আঘাত করেছে ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায়। ফলে, জাতীয় স্বার্থেই আজ বিশ্ব মঞ্চে সুর চড়াতে বাধ্য হয়েছে ভারত। তবে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক টানাপড়েন এবং আমেরিকার শুল্ক পরিবর্তন ভারতের উপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। এমতাবস্থায় আমেরিকার ক্ষোভ প্রশমন ও তাদের নিয়ন্ত্রিত জলপথের সুবিধা নেওয়ার স্বার্থেই ভারত এত দিন কৌশলগত কারণে নীরব ছিল— এমন জল্পনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে, এই প্রেক্ষিতে চিনের দাবি— ভারত আমেরিকার চোখরাঙানির ভয়ে ভীত এবং আমেরিকার অক্ষের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে— তা গভীর ভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বেজিংয়ের এই প্রচার মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতকে কোণঠাসা করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। কিন্তু, ভারতের এই বিলম্বিত পদক্ষেপ আসলে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। ইউক্রেন যুদ্ধ হোক কিংবা গাজ়া ও লেবাননের সংঘাত— সমস্ত আন্তর্জাতিক সঙ্কটেই ভারত নিরপেক্ষ ভারসাম্য বজায় রেখে এসেছে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষায় ভারতের উচিত ছিল অনেক আগেই আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মিলিত চাপ সৃষ্টি করা।
আপাতত দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে চিনের কোণঠাসা করার চেষ্টাকে ব্যর্থ করতে ভারতকে তার কূটনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নতির জন্য আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যেমন জরুরি, তেমনই বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব স্বাধীন কণ্ঠস্বর বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপুঞ্জে জয়শঙ্করের বিলম্বিত কিন্তু অনমনীয় অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, কোনও চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে ভারত তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বিশ্ব শান্তির পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত। বিশ্বরাজনীতির এই সঙ্কটে ভারতকে এখন আরও সাহসী ও নীতি-ভিত্তিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে হবে।