কলকাতার সর্বজনীন দুর্গাপূজার সর্বাঙ্গে যত ঘুণ ধরেছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনাটি। সর্বজনীন পূজা সততই রাজনৈতিক— রাজ্যে পালাবদলের পরে ক্ষমতাসীন বিজেপির মেজ-সেজ নেতারা একের পর এক পূজা দখল করেছেন। তাঁদের অনেকেরই বড় মাপের পূজা সংগঠনের কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তবে দখলদারির বাসনা আছে আঠারো আনা। দুর্ঘটনা ঘটার পরে সেই নেতারা তার দায়িত্ব নেবেন, এমন আশা করতে রাজ্যবাসীর সাহস হবে না। তাঁরা দায়িত্ব নেননিও বটে। পুলিশও কিছু কুচো কর্মকর্তাকে আটক করে দায়িত্ব সেরেছে। তবে, রাজ্যের অন্য প্রান্ত থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে এক মুসলমান যুবককে— যিনি নাকি ভুয়ো ভিডিয়ো ছড়িয়ে চোরবাগানের ঘটনা সম্বন্ধে মিথ্যা প্রচার করছিলেন। সন্দেহ কী, নতুন পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার পূজার কর্তা হওয়া ‘নতুন ভাইপো’, অথবা পূজার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে অধিষ্ঠিত স্থানীয় বিধায়কের চেয়ে এই যুবকের দোষ নিশ্চয়ই অনেক বেশি! রাজনীতি অন্যত্রও। ঘটনার পর প্রকাশ্যে এসেছে, পূজার ভিড় সামলানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বহু পুলিশকর্মীকে এ বার দায়িত্বে রাখা হয়নি— তাঁদের গায়ে পূর্বতন জমানার গন্ধ ছিল বলেই বোধ হয়। কলকাতা পুলিশ যে কুশলতায় পূজার ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে, তা নিয়ে এই শহরের গর্ব ছিল। রাজনীতি এসে সেই গর্বকেও নিয়ে গেল।
থিমের নামে কলকাতার অলি-গলি-রাজপথে যে পূজাগুলি হয়, তার সুরক্ষা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতাও স্পষ্ট করে দিল চোরবাগান। এখন অভিযোগ উঠছে, এই মণ্ডপে নাকি যথেষ্ট আলো ছিল না; প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ সঙ্কীর্ণ ছিল; মণ্ডপের মধ্যে এমনই দমবন্ধ অবস্থা ছিল যে, অনেকেরই শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। দুর্ঘটনা ঘটার আগে এই জিনিসগুলি কারও চোখে পড়ল না কেন? এবং, শুধু চোরবাগান নয়, কলকাতার বহু বড় সর্বজনীন পূজার মণ্ডপেই অবস্থা অবিকল এক। যে-হেতু মণ্ডপের সামনে দর্শনার্থীদের লাইনের দৈর্ঘ্য এবং অপেক্ষার সময়ের ভিত্তিতেই পূজার সাফল্য মাপা দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে— ফলে আশঙ্কা হয়, প্রবেশের পথ সঙ্কীর্ণ করা হয়তো কৌশলেরই অঙ্গ। পূজার অনুমতি দেওয়ার আগে মণ্ডপের সুরক্ষার বিষয়গুলি যথেষ্ট খতিয়ে দেখা হয়েছিল কি? এই প্রশ্নের সরকারি উত্তরও জানা; প্রকৃত উত্তরও নগরবাসীর অজানা নয়। কোন পূজা কোন নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় চলে, তা-ই যদি সর্বাপেক্ষা বড় বিবেচনা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সুরক্ষা বা স্বাচ্ছন্দ্যের মতো প্রশ্নগুলি নেহাতই গুরুত্বহীন হয়। কলকাতার সর্বজনীন পূজাগুলিতেও সেই ঘটনাই ঘটেছে। চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা ভয়াবহ— কিন্তু, প্রশাসনিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই কি শহরকে সেই বিপদের পথে এগিয়ে দেয়নি?
আরও একটি প্রশ্ন ক্রমশই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে— শহর জুড়ে এতসংখ্যক বড় মাপের বা বড় বাজেটের বা বড় থিমের পূজা কেন? পূজায় বহু মানুষের আনন্দ হয়, বহু মানুষের কর্মসংস্থান ঘটে, রাজ্যের অর্থনীতিতে পূজা একটি বড় ভূমিকা পালন করে, সত্য কথা। কিন্তু, বৃহৎ মাত্রার সর্বজনীন পূজার আয়োজন করার প্রাথমিক শর্ত হল, তার যথাযথ পরিসর। রাস্তা আটকে, স্থানীয় মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে, দুর্ঘটনার প্রবল ঝুঁকি তৈরি করে পূজার আয়োজন কোনও যুক্তিতেই সমর্থন করা চলে না— উৎসবের যুক্তিতেও নয়, অর্থনীতির যুক্তিতেও নয়। সহজ কথা হল, যাদের পূজা করার মতো যথেষ্ট জায়গা আছে, ভিড় সামলানোর মতো রাস্তার পরিসর আছে, যেখানে পূজা করলে স্থানীয় মানুষদের আপত্তি নেই, সেখানেই বড় পূজার আয়োজন করা চলে, অন্যত্র নয়। বহু বছরের পরম্পরা, ক্লাবকর্তাদের আবেগ, নেতার কর্তাগিরির বাসনা, কোনও যুক্তি দিয়েই শহরের অধিকাংশ পূজার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা চলে না। চোরবাগানের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্রশ্নের মীমাংসা জরুরি।