E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বহুস্তরী নীতি

ভারত ও তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর দীর্ঘ কাল ধরেই পাকিস্তানের ছায়া স্পষ্ট। কাশ্মীর বিতর্ক হোক বা ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত— তুরস্ক বরাবরই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

শেষ আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২৯

সেপ্টেম্বরের শেষে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় প্রথা মেনে আবারও কাশ্মীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তায়িপ এর্ডোয়ান। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ মেনে আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের আহ্বান জানান তিনি। ভারতের তীব্র আপত্তি অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর এই চেনা কূটনৈতিক কৌশল এর্ডোয়ান এ বারও বজায় রাখেন। তবে চেনা সমীকরণ ভেঙে অক্টোবরের গোড়াতেই তুরস্ক থেকে মাদক পাচারকারী নভপ্রীত সিংহকে ভারতে প্রত্যর্পণ করার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছে। বস্তুত, রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে মতবিরোধ প্রকাশের পর পরই এই ধরনের কৌশলগত সহযোগিতা স্পষ্ট করে দেয় যে, নয়াদিল্লি ও আঙ্কারার কূটনৈতিক সম্পর্কে মৌখিক বিরোধিতার নেপথ্যে রয়েছে এক বাস্তবসম্মত ভূ-রাজনীতি।

ভারত ও তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর দীর্ঘ কাল ধরেই পাকিস্তানের ছায়া স্পষ্ট। কাশ্মীর বিতর্ক হোক বা ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত— তুরস্ক বরাবরই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এফএটিএফ-এর ধূসর তালিকা থেকে পাকিস্তানের মুক্তি এবং পরমাণু সরবরাহকারী গোষ্ঠীতে ভারতের সদস্যপদের বিরোধিতা করে আঙ্কারা বার বার দিল্লির স্বার্থে আঘাত করেছে। ধরে নেওয়া যায়, মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ নেতা হওয়ার ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই প্রেসিডেন্ট এর্ডোয়ানকে এই পাকিস্তান-ঘেঁষা নীতি অনুসরণে বাধ্য করছে। ভারতও বসে থাকেনি। আঙ্কারার কাশ্মীর কার্ডের জবাবে নয়াদিল্লি সাইপ্রাসের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন জানিয়েছে এবং আর্মেনিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করে তুরস্কের উপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে নানা ইশারায় বোঝা যাচ্ছে, এই ঠান্ডা লড়াই পেরিয়ে দুই দেশ কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্কে এখন বাস্তবমুখী হতে চায়। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পারস্পরিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে চায়। ২০২৩ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের সময় তুরস্কের প্রতি ভারতের হাত বাড়িয়ে দেওয়াটা আঙ্কারার নীতি-নির্ধারকদের কাছে নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নভপ্রীত সিংহের মতো অপরাধীকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া সেই বাস্তববাদী সম্পর্কেরই ফসল।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তুরস্কের পক্ষে ভারতকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। দ্রুততম গতিতে এগিয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ বাজার হিসেবে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ ও নির্মাণ ক্ষেত্রের সক্ষমতা অগ্রাহ্য করা কঠিন। একই ভাবে, ভারতও তার ‘ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকনমিক করিডর’ (আইএমইসি)-এর মতো প্রকল্পের সাফল্যের জন্য পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে থাকা তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারে। ফলে, ভারত ও তুরস্কের সম্পর্ক আজ আর কেবল ‘বন্ধু বা শত্রু’র সরল সমীকরণে সীমাবদ্ধ নেই। কাশ্মীর নিয়ে আঙ্কারার অবস্থান দিল্লির জন্য সব সময়ই সংবেদনশীল, তবে কূটনীতি শেখায় যে এক বা একাধিক ক্ষেত্রে মতবিরোধের কারণে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে না। কাশ্মীর বা পাকিস্তানের প্রশ্নে দুই দেশের মতপার্থক্য হয়তো রাতারাতি মিটবে না, তবে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের তাগিদে এই দুই আঞ্চলিক শক্তি নিকটবর্তী হতে পারে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
India-Pakistan Turkey Pakistan

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy