গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের মধ্যে যে ‘ভঙ্গুর শান্তি’ বজায় ছিল, তা ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সান’আ বিমানবন্দর ও সৌদি ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে নতুন করে শুরু হওয়া হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনার পাশাপাশি অতি সম্প্রতি লোহিত সাগরে দুই সৌদি তেলবাহী জাহাজের উপরে হুথিদের হামলার দাবি আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। গত কয়েক বছর ধরেই ইয়েমেনে তাদের সরাসরি সামরিক সহযোগিতা কমানোর চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে ইঙ্গিত স্পষ্ট যে, সৌদি নেতাদের ধারণা, হুথিরা আবারও একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে উঠছে, যদি তাদের ইরানের আঞ্চলিক কৌশলেরই একটি বর্ধিত অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্য দিকে, পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার নেপথ্যে একটি বড় কারণ: সাম্প্রতিক হামলার আগে হুথিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের বিষয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলমনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন। এমতাবস্থায়, সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনও সংঘাত ঘটলে তেহরান সেটিকে বৃহত্তর ইরান-আমেরিকা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে দেখবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
লক্ষণীয়, এ-হেন সংঘাতে আজ সবচেয়ে উদ্বিগ্ন পাকিস্তান। ইসলামাবাদ আজ বহু বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গেও কার্যকর সংযোগ বজায় রেখে ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে। কিন্তু সৌদি ও হুথিদের সংঘাত তীব্র হলে এই ভারসাম্য বজায় রাখা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে, পরিস্থিতির জটিলতায় সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিটি। কারণ, চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লিখিত আছে যে, কোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয় দেশের বিরুদ্ধেই আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করা হবে। বর্তমানে চুক্তির অংশ হিসেবে কয়েক হাজার পাকিস্তানি সেনা এবং বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। দুই তরফে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে রিয়াদকে করা চুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এই সেনাদেরই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ বাড়বে পাকিস্তানের উপর। তা ছাড়া, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল পাকিস্তান। হরমুজ় প্রণালী ও লোহিত সাগর— উভয় অঞ্চলকেই প্রভাবিত করে এমন কোনও বৃহত্তর সংঘাত পাকিস্তানের অর্থনীতির উপরও নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।
সমস্যা অন্যত্রও। সৌদি আরব, ইরান এবং তাদের মিত্রদের সংঘাত পাকিস্তানের সামাজিক সংহতির উপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে, দেশটিতে প্রচুর শিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ থাকায়। এমতাবস্থায় সৌদি-হুথি সংঘাত যদি বৃহত্তর আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের রূপ নেয়, তবে পাকিস্তান কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম জটিল এক বিদেশনীতির পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে— প্রতিবেশী ইরানকে প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি বজায় রাখা। ক্রমবর্ধমান সংঘাতে জর্জরিত পশ্চিম এশিয়ায় এ কথা বলা যতটা সহজ, কাজে পরিণত করা ততটাই কঠিন।