E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

মানবিক

প্রাণিকল্যাণের প্রশ্নটি এখনও অগ্রাধিকার পায় না। পথপ্রাণীর সংখ্যা, তাদের স্বাস্থ্যসমস্যা, নির্বীজকরণ, টিকাকরণ, চিকিৎসা, আহত প্রাণীর উদ্ধার— এ সব নিয়ে প্রশাসনিক পরিকাঠামো বহু জায়গাতেই অপ্রতুল।

শেষ আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:১৭

জম্মু পুরনিগমের কোট বালওয়াল এলাকায় পোষ্য ও পথপ্রাণীদের জন্য বিশেষ শ্মশান তৈরির উদ্যোগ একটি অত্যন্ত ইতিবাচক, মানবিক উদ্যোগ। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয়, এত দিন নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় এলাকাবাসী মৃত পোষ্যকে তাওয়াই নদীর তীরে বা কোনও ফাঁকা জমিতে সমাধিস্থ করতেন। আগামী এক মাসের মধ্যে চালু হতে চলা শ্মশানটিতে ১০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত ওজনের অবোলা প্রাণীদের দাহকার্য সম্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকবে, সৎকার-শেষে পোষ্যের ভস্ম ইচ্ছুক অভিভাবকের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই উদ্যোগটিকে সামাজিক পরিবর্তনের স্বীকৃতি-স্বরূপ বলা যায়, কারণ পোষ্যকে পরিবারের সদস্য সন্তানের মতো দেখবার প্রবণতা বৃদ্ধিমান। সে মানুষের ঘর পাহারা দেয়, আয়ের উৎস হয়, সঙ্গী হয়, শিশুর সঙ্গে বড় হয়। মৃত্যুর পর তাকে আবর্জনার মতো ফেলে আসা কোনও ভাবেই সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

এ দেশে অবশ্য প্রাণিকল্যাণের প্রশ্নটি এখনও অগ্রাধিকার পায় না। পথপ্রাণীর সংখ্যা, তাদের স্বাস্থ্যসমস্যা, নির্বীজকরণ, টিকাকরণ, চিকিৎসা, আহত প্রাণীর উদ্ধার— এ সব নিয়ে প্রশাসনিক পরিকাঠামো বহু জায়গাতেই অপ্রতুল। মৃত প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই উদাসীনতা লক্ষণীয়। তবে বড় শহরগুলি বিষয়টিতে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে; চেন্নাই পুরসভার তিনটি কেন্দ্রে পোষ্যের বিনামূল্যে শেষকৃত্যের ব্যবস্থা রয়েছে। হায়দরাবাদে পরিবেশগত বিধি মেনে পুরসভার জমিতে প্রাণিকল্যাণ সংস্থার সহযোগিতায় পৃথক পোষ্য শ্মশান তৈরি হয়েছে। মুম্বই এই বিষয়টিতে দীর্ঘ আইনি টানাপড়েনের সাক্ষী হয়েছে। দিল্লিতে কুকুরের ও কলকাতায় পৃথক পোষ্য শ্মশানের ব্যবস্থা পরিকল্পনার স্তরে। কলকাতায় নিউ টাউন এলাকায় পোষ্য কুকুরের সমাধিক্ষেত্র, দমদমে পোষ্যের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা থাকলেও এগুলি বিচ্ছিন্ন ভাবে অবস্থিত, সম্যক প্রচার ও জনমানসে সচেতনতার অভাব এবং বৃহত্তর কলকাতায় ও গ্রাম-এলাকায় পরিষেবা সহজলভ্য নয়। এই ব্যবস্থাকে পুরসভা বা পঞ্চায়েতের তত্ত্বাবধানে সর্বজনীন ভাবে নাগরিক পরিষেবায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, প্রাণীর শেষকৃত্যের জন্য পৃথক পরিকাঠামো আসলে নাগরিক স্বাস্থ্যব্যবস্থারই অংশ।

তাই, শুধু সচ্ছল পরিবারের পোষ্যই নয়, পথকুকুর এবং অন্যান্য পথপ্রাণীর মৃতদেহের বৈজ্ঞানিক শেষকৃত্যের ব্যবস্থা বাঞ্ছনীয়। মৃত প্রাণীর দেহ নদীর ধারে, খোলা জমিতে বা জনবসতির আশপাশে ফেলে রাখা হলে মাটি ও জলের দূষণের আশঙ্কা থাকে, অন্য প্রাণীর সংস্পর্শে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। কোনও ধর্মীয় বিশ্বাসকে অগ্রাধিকার নয়, জৈবিক ও স্থানসঙ্কটের কারণে বৈজ্ঞানিক মতে দাহই পশুদেহ সৎকারের প্রকৃষ্ট উপায় বলে স্বীকৃত। এ ক্ষেত্রে একটি সামাজিক দৃষ্টিকোণগত প্রশ্নও প্রণিধানযোগ্য। দেখা গিয়েছে, পশু-প্রাণীর ক্ষেত্রেও মানুষ বিভাজন তৈরি করছে। পোষ্য এবং পথপশুর কদর ও আদর আলাদা। মৃত্যু এই বিভাজনকেও অর্থহীন করে দেয়। শহর এবং গ্রামে তাই পশুপ্রাণীর শেষ যাত্রা বিষয়ে একটি সুসংহত ব্যবস্থা প্রয়োজন— অসুস্থতায় বা দুর্ঘটনায় মৃত প্রাণী সংগ্রহের নির্দিষ্ট পরিষেবা, বৈজ্ঞানিক সৎকারের পরিকাঠামো এবং পথপ্রাণীর ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত বা পুরসভার স্পষ্ট দায়ভার। প্রাণীকে ভালবাসা মানে শুধু আদর করা নয়; তার অসুস্থতা, বার্ধক্যের দায়িত্ব এবং মৃত্যুর পরের মর্যাদা নিশ্চিত করা।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Street Dog Pet burning ghat

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy