E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বারুদ নিয়ে খেলা

পশ্চিমবঙ্গে এত কাল বাজির বিপদ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবটি স্পষ্ট ছিল। অথচ, এক সময় নিষিদ্ধ বাজি রোখার বন্দোবস্তটি যথেষ্ট ঢাকঢোল পিটিয়েই করা হয়। আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল, উৎসবের দিনে নির্ধারিত মাত্র কয়েক ঘণ্টা শুধুমাত্র সবুজ বাজি ফাটানো যাবে।

শেষ আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:২৯

পশ্চিমবঙ্গ রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রথম দীপাবলি উদ্‌যাপনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে। বিগত কয়েক বছরের প্রবণতা বলে, দীপাবলি এ রাজ্যে যতখানি আলোর উৎসব, ঠিক ততখানিই শব্দতাণ্ডব ও বায়ুদূষণেরও উৎসব। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে কী ভাবে শহর অতিষ্ঠ হতে পারে শব্দসীমা লঙ্ঘনকারী বাজির আওয়াজে, কী ভাবে বৈধ বাজির আড়ালে অবাধে চলতে পারে নিষিদ্ধ বাজির ব্যবসা— সমস্ত কিছুর সাক্ষী হয়েছে কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত। এমত পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দিনের অবৈধ কাজকর্মকে সুপ্রশাসন কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করবে, বেলাগাম আমোদ এবং সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে পরিবেশ ও নাগরিক সুরক্ষাকে স্থান দেবে— এটাই কাম্য ছিল। কিন্তু, আপাতত, এ রাজ্যের ঘটনাপরম্পরা তেমন ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং, বাজি বাজারকে ঘিরে দখলদারির রাজনীতি বিপদকে আরও উস্কে দেবে কি না— সেই আশঙ্কাই জাগছে।

এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গে এত কাল বাজির বিপদ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবটি স্পষ্ট ছিল। অথচ, এক সময় নিষিদ্ধ বাজি রোখার বন্দোবস্তটি যথেষ্ট ঢাকঢোল পিটিয়েই করা হয়। আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল, উৎসবের দিনে নির্ধারিত মাত্র কয়েক ঘণ্টা শুধুমাত্র সবুজ বাজি ফাটানো যাবে। সেই অনুযায়ী, সবুজ বাজি তৈরির প্রশিক্ষণ দেবে ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল এঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (নিরি)। প্রশিক্ষণের পরে পরীক্ষায় পাশ করলে তবেই মিলবে বাজি তৈরির অনুমতি। নিয়মানুযায়ী, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের বাজি প্রস্তুত করার পর নিরি-র দফতরে তা আলাদা আলাদা ভাবে পাঠাবে পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষায় সে বাজি পাশ করলে প্রতিটির জন্য আলাদা শংসাপত্র প্রদান করবে নিরি। সেটাই কিউআর কোড হিসাবে বাজির বাক্সের গায়ে ছাপা থাকবে। নির্দিষ্ট মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে স্ক্যান করলে প্রস্তুতকারী সংস্থা বিষয়ে যেমন জানা যাবে, তেমনই নিশ্চিত হওয়া যাবে বাজির উপকরণ বিষয়ে। বলা হয়েছিল, এর মাধ্যমেই বৈধ বাজির সঙ্গে অবৈধ বাজির ফারাকটি ধরা সহজ হবে। কিন্তু নানা অব্যবস্থায় তা সম্ভব হয়নি। উদাসীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, গত বছর টালা পার্কে বাজি পরীক্ষার সময় নিরি-র কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেননি। ছিল না ধোঁয়া পরীক্ষার বন্দোবস্তও, দূষণক্লান্ত মহানগরীর পক্ষে যা সবিশেষ উদ্বেগের।

বরং, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ শব্দের ঊর্ধ্বসীমা ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১২৫ ডেসিবেল করে দেওয়ায় শব্দতাণ্ডব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। এক দিকে শব্দসীমা বৃদ্ধি, অন্য দিকে নজরদারির অভাব ভেঙে দিয়েছে সমস্ত নির্দেশ, নিয়ম। হাসপাতালের মতো ‘সাইলেন্ট জ়োন’ও কেঁপেছে বাজির আওয়াজে, বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়েছে শহরের, বিকট শব্দে অসুস্থ, বিনিদ্র হয়েছে শিশু থেকে প্রবীণ। অথচ, এই বছর সেই অ-নিয়মকে রোখার সক্রিয় চেষ্টা কই? বরং কারা বাজির বাজার বসাবেন, কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, কতগুলি স্টল আলাদা হবে— তা নিয়ে তরজা অব্যাহত। এই রাজনৈতিক দখলদারির ভ্রান্ত নীতিতে হেঁটেই সদ্য দুর্গাপুজোর দিনে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছে শহর কলকাতা। তার থেকে এখনও শিক্ষা নিতে না পারলে আগামী দিনে বাজির বিপদ আরও বৃহত্তর আকার নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে বারুদ নিয়ে খেলার মূল্য চোকাতে হবে সেই নাগরিককেই।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Firecrackers Firecrackers Market West Bengal government Diwali BJP noise pollution safety measures Environmental awareness

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy