পরিবর্তিত পশ্চিমবঙ্গে অন্তত একটি বিষয়ের পরিবর্তনের বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত নেই: তা হল আইনের শাসন। সম্ভবত সরকারি মন্ত্রী থেকে শুরু করে শাসক দলের নেতা ও কর্তারাও এ নিয়ে একমত হবেন, কেননা তাঁদের অনেককেই আজকাল এমন মন্তব্য করতে শোনা যায় যাতে মনে হয় তাঁরা আইনের শাসনের অভাব দেখে নিজেরাই বিব্রত হয়ে পড়েছেন। তখন তাঁদের বাক্য শুরু কিংবা শেষ হয় ‘বিজেপি কিন্তু মনে করে না’, কিংবা ‘এর সঙ্গে বিজেপির কিন্তু কোনও যোগ নেই’ ইত্যাদি দিয়ে। মন্তব্যগুলি তবু তাঁদের করে যেতে হয়, কেননা তাঁরা জানেন, বিগত তৃণমূল আমলের এই অপশাসনেই পশ্চিমবঙ্গব্যাপী মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন, এবং বিজেপির নির্বাচনী পালে জোর হাওয়া লেগেছিল। অথচ আশ্চর্য, নতুন সরকারের নেতারা এক দিকে আইনের শাসনের অনুপস্থিতির বিষয়টি জানেন, মানেন বলেই নিয়মিত আত্মদায় অস্বীকার করেন, আর অন্য দিকে কিছুতেই পরিবর্তন ঘটাতে পারেন না। তোলাবাজি বন্ধ করতে পারেন না, বিরুদ্ধমতাবলম্বী সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করার অভ্যাস থামাতে পারেন না, বিরোধী দলের অফিস ভাঙচুর কিংবা নেতাদের বাড়িতে হানা ও তাণ্ডব রোধ করতে পারেন না, ডিম ছোড়ার নৈরাজ্য বন্ধ করতে পারেন না। সাম্প্রতিক কালে ভারতের অন্যত্র এমন ধারাবাহিক ভাবে শারীরিক বা সামাজিক আক্রমণের ধারা কোথাও ঘটেছে বলে মনে হয় না, অথচ পশ্চিমবঙ্গে তা নিত্য চলমান। গত সাড়ে চার মাসে শাসক দল কিংবা তাদের সহযোগী দলের কর্মীদের নেতৃত্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাতের বেলায় হানা চলেছে, সংখ্যালঘুর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ক্রুশ ভেঙে ফেলা হয়েছে, হকার উচ্ছেদের সময় অহেতুক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে, আন্তঃ-সম্প্রদায় বিবাহ চলবে না বলে পাড়ায় হুমকি-রাজ চলেছে, রাজনৈতিক মিছিলে অশান্তি হলে দুষ্কৃতীদের শাস্তি দেওয়ার নামে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অপচেষ্টা চলেছে। প্রতিবাদী ছাত্রসমাজকে লক্ষ্য করে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং দ্ব্যর্থহীন ভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘হয় আমরা নয় ওরা’ থাকবে।
অবশ্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় শাসকের এই প্রবল ও গভীর অনীহা রাজ্যে নতুন কোনও ঘটনা নয়। দীর্ঘ কাল ধরে দলীয় রাজনীতির অত্যধিক দাপটে এই রাজ্যের সমাজ নিষ্পেষিত হয়ে আসছে। যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তারই বজ্রমুষ্টিতে ওষ্ঠাগতপ্রাণ হয়েছে। গত এপ্রিলে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ইডি তদন্তে সক্রিয় বাধাদানের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন ছিল: পশ্চিমবঙ্গে কি সাংবিধানিক শাসনের লয় ঘটেছে? উত্তর এতই ইতিবাচক যে প্রশ্নটিই যেন আলঙ্কারিক ছিল। তবে সাম্প্রতিক কালে তা যেন ক্রমশই আরও নিকৃষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছে।
ঘটনা হল, শাসনের জায়গায় অপশাসনের এই ক্রমাগত সীমা-অতিক্রমণের পথ একটি গভীর আলোচনার দাবি রাখে। এবং সেই আলোচনার সূচনায় মনে রাখা দরকার, আইন বস্তুটি আসলে তার ন্যায্যতা লাভ করে প্রয়োগসাপেক্ষেই— অর্থাৎ আইন কিন্তু এমন ভাবেও ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করা যায় যা আসলে অগণতান্ত্রিক। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ বিচারপতি টম বিংহ্যাম-এর ‘রুল অব ল’-র বিশ্লেষণ স্মরণীয়, ২০০৬ সালের তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা পরে একটি জরুরিপাঠ্য বইতে রূপ নিয়েছিল। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে বোঝা যায়, হকার উচ্ছেদ থেকে প্রতিবাদী কণ্ঠরোধ, অনেক কিছুকেই এই বিশ্লেষণের আলোকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কোন আইনের কতখানি প্রয়োগ কোথায় ন্যায্য, এবং কোথায় অন্যায্য, এই বিবেচনা বিশেষ গুরুতর, নতুবা আইন দিয়ে শাসন (রুল বাই ল) কখনও আইনের শাসন (রুল অব ল) হয়ে উঠতে পারে না। তবে যে শাসক কথায় কথায় কত আসনে জিতে এসে কত ক্ষমতার অধিকারী, তা বোঝাতে ব্যস্ত, তার কর্মপ্রক্রিয়ায় এই বিবেচনার প্রতিফলন পড়া আদৌ সম্ভব কি না, প্রশ্নটা সেখানেই।