E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

লড়াই চলছে

অনস্বীকার্য যে, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র রক্ষা এখনও বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ততখানি গুরুত্ব পায়নি। সেখানকার অধিবাসীদের সংগ্রামের ইতিহাসও নয়।

শেষ আপডেট: ১৬ অগস্ট ২০২৬ ০৫:১১

ভারতের আশিতম স্বাধীনতা দিবসে এই সংবাদপত্রে প্রকাশিত সুগত বসু-র ‘পূর্ণ সাম্যবাদের অঙ্গীকার’ (১৫-৮) শীর্ষক প্রবন্ধের একটি অংশ উল্লেখ্য— “ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ১৫ অগস্ট একাধারে আনন্দের ও দুঃখের দিন।” এক দিকে এই দিনটি অপরিসীম আনন্দের, গর্বের। সুদীর্ঘ প্রায় দু’শো বছরের পরাধীনতার শাসন-শৃঙ্খল ছিঁড়ে মুক্তি উদ্‌যাপনের দিন। আবার একই সঙ্গে তা দেশভাগের মর্মান্তিক ক্ষতকে আরও এক বার ফিরে দেখারও দিন। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ এবং তৎপরবর্তী কালে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে যে স্বজনবিচ্ছেদের যন্ত্রণা, গভীর অবিশ্বাস আর রক্তপাতের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছিল, সেই ইতিহাসকে স্বাধীনতার পুণ্যলগ্নে স্মরণ করা প্রয়োজন। কারণ, সেই অসহনীয় যন্ত্রণা শুধুমাত্র সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এক দেশের আর্থসামাজিক ও প্রশাসনিক স্তরেই অনুভূত হয়নি, র‌্যাডক্লিফ লাইন এক অখণ্ড দেশকে তিন টুকরো করার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার জল, জমি, জঙ্গলকেও ভাগ করে দিয়েছিল। ভাগ হয়েছিল সুন্দরবনও। একদা যে বনাঞ্চল প্রাকৃতিক ঢালের মতো পূর্ব দিকের বিস্তীর্ণ উপকূল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত, দেশ ভাগের পর তার অধিকাংশই চলে গেল পূর্ব পাকিস্তানে (এখন, বাংলাদেশ)। শুধুমাত্র জঙ্গলের ভাগ-বাঁটোয়ারাই নয়, গঙ্গা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রের মোহনা জুড়ে ছডিয়ে থাকা এই ম্যানগ্রোভ সাম্রাজ্যে শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিপরীতে অসহায়, বিপন্ন উদ্বাস্তুদের লড়াইয়ের শিকড়টিও লুকিয়ে আছে এই পর্বেই, যা পরবর্তী দশকের পর দশক ধরে ক্রমশ পল্লবিত হয়েছে, প্রভাব ফেলেছে পরিবেশের উপর, নোনা জলে বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা স্থানীয়দের যাপনরীতির উপরেও।

অনস্বীকার্য যে, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র রক্ষা এখনও বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ততখানি গুরুত্ব পায়নি। সেখানকার অধিবাসীদের সংগ্রামের ইতিহাসও নয়। দেশভাগের পর মূলত দরিদ্র নিম্নবর্ণের বাস্তুহারা মানুষদের জায়গা হয়েছিল বিভিন্ন সরকারি শিবিরে, যার মধ্যে এক লক্ষণীয় সংখ্যককে পাঠানো হয়েছিল দণ্ডকারণ্যের খরা-অধ্যুষিত অঞ্চলে। সত্তরের দশকে বাংলার প্রথম সারির বাম নেতৃবৃন্দ দণ্ডকারণ্যের উদ্বাস্তু শিবিরগুলি পরিদর্শন করে আশ্বাস দেন, নির্বাচনে জিতলে বাস্তুহারা মানুষদের ফিরিয়ে আনা হবে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে। কিন্তু ১৯৭৭-এ বাম ফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। অতঃপর ১৯৭৮ সালে দেড় লক্ষেরও বেশি শরণার্থী দণ্ডকারণ্যের শিবির ছেড়ে পালিয়ে সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে আশ্রয় নেন। মরিচঝাঁপি সংরক্ষিত অরণ্যের একাংশে অবস্থিত ছিল, এবং সেই ‘সংরক্ষিত অরণ্য আইন’-এর অজুহাতেই পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ-প্রশাসন এই বাস্তুহারাদের হটাতে পূর্ণশক্তি নিয়োগ করে। পরিসংখ্যানে উঠে আসে, ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যেই পুলিশের গুলিচালনা, বিষপ্রয়োগ, অনাহার, চিকিৎসার অভাবে অন্তত সাত হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে লক্ষণীয় সংখ্যক মহিলা ও শিশু। বাস্তুহারারা দাবি করেছিলেন, মরিচঝাঁপি মূল সংরক্ষিত অরণ্যাঞ্চল থেকে দু’টি বড় নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। সেখানকার পরিবেশও বাঘের বসবাসের উপযুক্ত নয়। বরং, তাঁদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দিলে তাঁরা অরণ্যায়নের কাজটিকে এগিয়ে নিয়ে পারেন, কাঠ চুরিও রোধ করতে পারেন। সে আবেদনে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করা হয়নি।

সুন্দরবনের মানুষের লড়াইও এখনও থামেনি। লড়াইয়ের অভিমুখ এখন পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে। উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বিপন্ন অঞ্চলের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে সুন্দরবন। একের পর এক শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড়ের আগমন তারই চিহ্ন রেখে যায়। ঝঞ্ঝা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, বাঁধ ভাঙা সেখানে নিত্য সঙ্গী। নুনে ভরা জমিতে চাষাবাদ লাভজনক নয়। তাই গ্রামের পুরুষরা পাড়ি দেন ভিন রাজ্যে। লবণাক্ত জলে মীন-কাঁকড়া ধরে, বন্যার জলের সঙ্গে ঘর করে জটিল অসুখে ভোগেন মেয়েরা। উষ্ণায়নের অন্যতম পরিণতি ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’র সংখ্যা বৃদ্ধি। সুন্দরবনও সেই পথেই এগোচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬৯-২০১৯ সালের মধ্যে সুন্দরবন সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০ বর্গ কিলোমিটার জমি হারিয়েছে। ঘোড়ামারা দ্বীপ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার মুখে। দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তুহারাদের স্রোতের সাক্ষী হয়েছিল সুন্দরবন। স্বাধীনতার আট দশক পার করে ফের আবারও বাস্তুহারা হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে সেখানকার বাসিন্দারা।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Sundarban Environment

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy