E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সুযোগ বুঝে

যাদবপুর-অনুরাগীদের প্রতিবাদ স্বাভাবিক। তবে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও যে ভাবে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সপক্ষে কণ্ঠ ছেড়েছেন তাতে বোঝা যায়, রাজ্যের অন্যতম প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের অসম্মান নিয়ে রাজনীতি যুদ্ধ কত প্রবল হয়ে উঠেছে।

শেষ আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:২৯

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে খোদ প্রধানমন্ত্রীর মুখে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ও যে আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল, তা বিস্ময়কর হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। বারুইপুরের সভায় নরেন্দ্র মোদী যা বললেন তা তাঁর দলের চেনা লব্জ: যাদবপুরে পড়াশোনা হয় না, অরাজকতা হয়; তা দেশদ্রোহিতার আখড়া। বঙ্গ-বিজেপিরই আর এক নেতাকে উদ্ধৃত করলে— ‘অসভ্য বানানোর ফ্যাক্টরি’। ভোটের বাজারে হাওয়া গরম করতে এমন কত কথাই ভাসিয়ে দেওয়া হয়, এই কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর এই ‘আক্রমণ’ লঘু করা চলে না: জেএনইউ-এর উদাহরণ চোখের সামনেই, শাসকের বিরুদ্ধে কণ্ঠ ছাড়ার জন্য তার খোলনলচে বদলে দেওয়ার ‘প্রকল্প’টি এই মুহূর্তে ঘটমান, এবং যাদবপুরকেও একই বন্ধনীভুক্ত করে বিজেপির ঘুরেফিরে আক্রমণ শাণানো নতুন নয়। এর তীব্র প্রতিবাদ জরুরি। এর মধ্যেই তা করেছেন যাদবপুরের শিক্ষক-ছাত্র-প্রাক্তনীসমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকরা। বঙ্গ-সফররত প্রধানমন্ত্রীর কানেও সেই স্বর পৌঁছে গিয়েছে নিশ্চিত।

যাদবপুর-অনুরাগীদের প্রতিবাদ স্বাভাবিক। তবে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও যে ভাবে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সপক্ষে কণ্ঠ ছেড়েছেন তাতে বোঝা যায়, রাজ্যের অন্যতম প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের অসম্মান নিয়ে রাজনীতি যুদ্ধ কত প্রবল হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর কথার প্রতিবাদে সমাজমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকারের এনআইআরএফ-এ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাবর উচ্চস্থান অধিকারের কথা, এখানকার ছাত্রছাত্রীদের ‘মেধা’র কথা, সর্বোপরি তাদের ‘প্রশ্ন করার ক্ষমতা’কে গণতন্ত্রের সমার্থক বলে উল্লেখ করেছেন। এই সবই সত্য। তার সঙ্গে উল্লেখ্য যে এর আগেও যাদবপুর-পরিমণ্ডল থেকে উঠে-আসা প্রতিবাদে এই কথাগুলি বলা হয়েছে— শুধু কেন্দ্রের শাসকের বিরুদ্ধেই নয়, রাজ্যের শাসকের বিরুদ্ধেও। মনে রাখতে হবে, সাম্প্রতিক কালের ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ আন্দোলন ‘হোক কলরব’ এই যাদবপুরেই হয়েছিল, ছাত্রছাত্রীদের উপরে পুলিশের চড়াও হওয়ার মতো নিন্দনীয় ঘটনাও ঘটেছিল। নিকট অতীতে রাজ্য সরকারের নেতারাও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে একাধিক বার একাধিক ক্ষেত্রে বিষোদ্গার করতে ছাড়েননি। এর থেকেই স্পষ্ট: যাদবপুর ছাত্রসমাজ কেবল রাজনীতিবোধেরই পরিচয় দেয়নি, যে কোনও দিকের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দুর্মর সাহস দেখিয়েছে।

বোঝা যায়, কেন্দ্র বা রাজ্য, শেষ অবধি যে কোনও শাসকের কাছেই প্রতিবাদী বিরুদ্ধস্বর মানে নৈরাজ্য বা অসভ্যতার নামান্তর। তাই, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা, শিক্ষা, গবেষণা ও বৌদ্ধিক উৎকর্ষের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অবদান চোখের সামনে দেখেও শাসকের এই অভূতপূর্ব আক্রমণ। ভোটের আবহে এই আক্রমণের রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব মোটেও খাটো করে দেখা চলে না। এক দিকে যাদবপুর একটি রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়, রাজ্যটি বিরোধী-শাসিত, অতএব প্রধানমন্ত্রীর এই কামান দাগার নিহিতার্থ— যে সরকার রাজ্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাঁচাতে পারে না, বাংলার ভবিষ্যৎ সে কী ভাবে বাঁচাবে! তাল দিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীও, তাঁর মতে মুখ্যমন্ত্রীর রাজনীতির জেরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবল ক্ষতি হচ্ছে। উল্টো দিকে, মুখ্যমন্ত্রী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছেন, কেন্দ্র যে ‘একটা টাকাও’ এই বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয় না তা মনে করিয়ে। চেনা তরজা, চেনা রাজনৈতিক বুলি। কিন্তু তার উপরেও একটি স্বল্পচেনা কথা থেকে যায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আক্রমণ আসলে যে কোনও প্রতিবাদী সংস্কৃতিকে নিষ্পেষিত করে মারার প্রতিশ্রুতিতে বাঁধা। এই সংস্কৃতি যে-হেতু বাংলার সমাজের নিজস্ব অভিজ্ঞান, কেন্দ্রীয় শাসক বিজেপি এখন ভোটমুখী বাংলাকে নিজের সেই প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিতে ব্যস্ত।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Jadavpur University Narendra Modi

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy