দেশের প্রথম বেসরকারি ভাবে তৈরি অরবিটাল-ক্লাস বা কক্ষপথে পৌঁছতে সক্ষম রকেট ‘বিক্রম-১’এর সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ভারত মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন যুগে প্রবেশ করল। প্রযুক্তিগত সাফল্যের চেয়েও এই অভিযানটি একটি আত্মনির্ভরশীল, উদ্ভাবনমুখী ভারতের উত্থানকে চিহ্নিত করে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধওয়ন স্পেস সেন্টার থেকে ‘মিশন আগমন’-এর অন্তর্গত উৎক্ষেপিত ‘বিক্রম-১’এর সাফল্য ভারতকে আমেরিকা ও চিনের পর তৃতীয় এমন দেশে পরিণত করেছে, যাদের নিজস্ব বেসরকারি ক্ষেত্রের রকেট নির্মাণের সক্ষমতা রয়েছে। বেসরকারি স্টার্টআপ স্কাইরুট এরোস্পেস-এর তৈরি রকেটটি উন্নত কার্বন-কম্পোজ়িট উপাদান এবং ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত, যা এটিকে প্রচলিত উৎক্ষেপণ যানের চেয়ে হালকা, শক্তিশালী ও অধিক সাশ্রয়ী করে। এই ধরনের উদ্ভাবন ভারতকে টেলিযোগাযোগ, প্রতিরক্ষা, আবহাওয়া পূর্বাভাস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও ইন্টারনেট পরিষেবায় ব্যবহৃত ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণের দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্ববাজারে আরও বড় অংশ দখলের সুযোগ করে দেবে।
ভুললে চলবে না, বিক্রম-১’এর সাফল্য সম্ভব হয়েছে নীতিগত সংস্কারের জেরেও। ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, ‘ইন-স্পেস’এর প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত উদার নীতিমালার ফলে এমন এক পরিবেশ গড়ে উঠেছে, যেখানে স্টার্টআপগুলো উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, উপগ্রহ প্রযুক্তি এবং মহাকাশ-ভিত্তিক পরিষেবায় অবদান রাখছে। তবে, যে কোনও সাফল্য নতুন দায়িত্বও বয়ে আনে। স্কাইরুট এরোস্পেসকে তো বটেই, আগামী দিনে এই ক্ষেত্রে যারা সফল হবে, তাদের সকলকেই ধারাবাহিক কর্মদক্ষতা, সাশ্রয়ী মূল্য, নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণ এবং শেষ পর্যন্ত পুনরায় ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ যান তৈরির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা গড়ে তুলতে হবে। অন্য দিকে, ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো থেকে সম্প্রতি শতাধিক ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানী চাকরি ছেড়েছেন, বিভিন্ন স্টার্টআপে যোগ দিয়েছেন। কর্মী চলে যাওয়ার এই প্রবণতা এতটাই প্রকট যে, কর্মীদের ধরে রাখার লক্ষ্যে সংস্থাটিকে তাদের কর্মী-প্রস্থান নীতি পরিবর্তন করতে হয়েছে। এমতাবস্থায় মহাকাশ গবেষণার প্রতিযোগিতায় ভারতকে টিকে থাকতে হলে উন্নত গবেষণা-সুবিধা, প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিক ও অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে ইসরো-কে আরও শক্তিশালী করে তোলা অপরিহার্য।
একই সঙ্গে উচিত বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে প্রতিযোগী হিসেবে না দেখে বরং তাদের সঙ্গে ইসরোর সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরদার করা। এ ক্ষেত্রে নাসা এবং বেসরকারি শিল্পের মধ্যেকার অংশীদারির অনুরূপ একটি মডেল প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি গবেষণা ও বাণিজ্যিক বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে ‘আগমন’ কি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে উঠবে, না কি কেবলই একটি সাধারণ বাণিজ্যিক মহাকাশ পরিষেবা হিসেবে গণ্য হবে— সময়ই তা বলবে।