বিজ্ঞানী অশোক সেন বাঙালিকে কৃতজ্ঞ করলেন। যদিও তাঁর কর্মক্ষেত্র পশ্চিমবঙ্গ নয়, যদিও তাঁর মতো অসামান্য মেধাবী পদার্থবিদকে নিছক ‘বাঙালি’ বলে পরিচয় দেওয়ার মধ্যে এক প্রকারের সঙ্কীর্ণম্মন্যতা আছে— তবু তাঁর সুবাদে অনেক দিন পর বাঙালি কিঞ্চিৎ গৌরব অনুভব করার একটি সুযোগ পেল। এই আকালের দিনে তা কম কথা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাময়, ‘অস্কার ক্লেন’ পুরস্কার এ বার কলকাতায় জন্মানো ও বড় হয়ে ওঠা এক বাঙালি সন্তানের, যে শিরোপা নোবেল পুরস্কারের সমতুল্য কিংবা অধিক। ‘ফান্ডামেন্টাল ফিজ়িক্স’-এর যুগান্তকারী গবেষণা তাঁর— পুরস্কার কমিটির বয়ান উবাচ। পরবর্তী কালে তিনি দেশের অন্যত্র শিক্ষালাভ করলেও এ কথা স্মরণে রাখার মতোই যে আগাগোড়া তাঁর কর্মক্ষেত্র এই ভারতবর্ষ। সত্তর বছর বয়সি এই পদার্থবিদ এখনও নিজের অনুসন্ধিৎসার উৎস বলতে গিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহা এই দুই চিরবরেণ্য বাঙালি বিজ্ঞানীর কথাই উল্লেখ করেন। এও বলেন যে, তাঁর পিতৃদেব পদার্থবিদ্যার শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু বিদ্যালয় স্তরে তাঁর নিজের আগ্রহ ছিল অঙ্কে। সে এক সময় যখন মেধাবী বাঙালি ছেলেমেয়েরা কলেজে ভিড় করত বিজ্ঞান পড়তে— কলকাতার কলেজেই— সেখানকার অধ্যাপকরাই ছিলেন তাঁদের পথপ্রদর্শক। আজ পদার্থবিদ্যার অন্যতম জটিল তত্ত্ব ‘স্ট্রিং থিয়োরি’র অঙ্গনে শ্রীযুক্ত সেন-এর গবেষণার মূলবস্তুটি হয়তো আমবাঙালির পক্ষে দুরূহ হতে পারে, কিন্তু এই অবকাশে অস্তপ্রায় বঙ্গীয় ধী-ভুবন এবং এক বৃহৎ বাঙালি ঐতিহ্যের ‘গ্রিনরুম’ হিসাবে কলকাতারকৃতিত্ব নিয়ে বাঙালি আর এক বার ফিরে ভাবার অবকাশ পেলে মন্দ হয় না!
অবশ্য এ কেবল বাংলা বা বাঙালির দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। সমগ্র দেশেই বিজ্ঞানশিক্ষার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে— সে দিকে একই সঙ্গে বিষয়-বিশেষজ্ঞ এবং নীতিবিশারদরা দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। অশোক সেনও তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারতে বিজ্ঞানপড়ুয়াদের জন্য আরও উচ্চমানের প্রতিষ্ঠান তৈরি করা জরুরি। বেশ কিছু কাল ধরে এঞ্জিনিয়ারিং এবং তথ্যপ্রযুক্তির দিকে অত্যধিক মাত্রায় ঝুঁকে পড়ছেন এই দেশের ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকগণ। এই ধারা পেরিয়ে মৌলিক বিজ্ঞানে যদি আবার উৎসাহ ফিরিয়ে আনতে হয়, তা হলে অবশ্যই শিক্ষাদানের প্রতিষ্ঠানগুলিকে ততখানি উদ্দীপনাময় হয়ে উঠতে হবে। বিষয়টি এখনই জরুরি ভিত্তিতে ভাবা দরকার, ইতিমধ্যেই অনেক বিলম্ব হয়েছে। আরও একটি বিষয় বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করছে— তা হল মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব। সরকারি অর্থের গতি এখন কিছু বিশেষ ধরনের গবেষণার দিকে, এ কথা সর্বজ্ঞাত, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মৌলিক পদার্থবিদ্যা, রসায়ন কিংবা জীববিজ্ঞানের বহু মৌলিক গবেষণাক্ষেত্র, যেখানে বিশেষ মাত্রার আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়া গবেষণা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কেবল কঠিন নয়, অসম্ভব। এই দিক দিয়ে এক পা পিছিয়ে যাওয়া আসলে এক যুগ আগে তলিয়ে যাওয়ার শামিল। বিশ্বের অন্যান্য উচ্চাশী দেশ যখন আগের অপেক্ষা অনেক বেশি মাত্রায় বিজ্ঞান গবেষণায় মন দিচ্ছে, তখন ভারত কোন পথে? উত্তরটি চোখের সামনেই। তা দেখতে চাওয়া না-চাওয়ার উপর নির্ভর করবে এ দেশের ভবিষ্যৎ।