এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশন ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে যে প্রবল বিক্ষোভ আন্দোলনে রাজধানী দিল্লি উত্তাল, অনেক দিক থেকেই তা সাম্প্রতিক সময়ের এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। রাজনৈতিক অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও স্বীকারোক্তি অতিক্রম করে এই আন্দোলন আসলে ভারতীয় গণতন্ত্রের মৌলিক পরীক্ষায় পর্যবসিত হয়েছে। সেই পরীক্ষার একটি দিক প্রতিবাদীদের উপর পুলিশি ও প্রশাসনিক নিগ্রহ। বিক্ষোভকারী বনাম পুলিশ— এই ছবি ভারতের দিকে দিকে দেখে যে-কোনও ভারতীয়ই অভ্যস্ত। কিন্তু এই বারের ছবিটি সম্পূর্ণ আলাদা। বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের সাংসদরা অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশকর্মীরা তাঁদের আটকাতে গিয়ে শারীরিক ভাবে আঘাত করেছেন। মহিলা সাংসদদের পোশাক নিয়ে টানাটানি করছে পুলিশ, এমন ভিডিয়োও সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে জানিয়েছেন, তাঁদের আটক করার সময় পুলিশ রীতিমতো বলপ্রয়োগ করেছে। রাহুল গান্ধীকেও যে ভঙ্গিতে পুলিশ আটক করেছে, তার মধ্যেও অহেতুক বলপ্রয়োগের প্রবণতা স্পষ্ট। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা-সহ অন্য প্রতিবাদীদের ভিডিয়ো, যেখানে তাঁরা আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানাচ্ছেন যে, এই হিংস্রতা পুলিশের কীর্তি। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন রাজনৈতিক, কিন্তু তাতে বিরোধীরা হিংস্রতার আশ্রয় নেননি। মহাত্মা গান্ধীর জন্মমাসে একটি অহিংস গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে প্রতিহত করতে পুলিশ বলপ্রয়োগের পথে হাঁটছে, ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে এটি সুসংবাদ নয়।
আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন তিন মহিলা সাংবাদিক। তাঁরা বলেছেন, দিল্লির বর্তমান আন্দোলন চলাকালীন তাঁরা যখন খবর সংগ্রহ করছিলেন, তাঁদের যৌন হেনস্থা ঘটেছে। অভিযুক্তরা পুলিশকর্মী। উল্টো দিকে, দিল্লি পুলিশ এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে জানিয়েছে যে, তিনি একটি ভুয়ো ভিডিয়ো তৈরি করেছিলেন, যাতে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের উর্দি পরিহিত এক ব্যক্তি এক মহিলাকে যৌন হেনস্থা করছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, এমন ভিডিয়োর পিছনে কোনও গভীরতর ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই অভিযোগের সত্যাসত্য বিচারের প্রশ্নটি তদন্ত শেষ হওয়া অবধি বকেয়া রাখতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে, জুলাইয়ের যন্তর মন্তর বিক্ষোভের সময়ও পুলিশ আধিকারিকের নামে মহিলাদের যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছিল। সে সময়ই দিল্লি পুলিশের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার সন্দীপ লাম্বার ভিডিয়োও ছড়িয়েছিল সমাজমাধ্যমে, যাতে দেখা গিয়েছিল যে, তিনি এক মহিলা বিক্ষোভকারীকে চড় মারছেন। ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ হিসাবে লাম্বাকে যন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে তাঁর পুরনো পোস্টিং-এ ফেরত পাঠানো হয়। পরে আর তা নিয়ে উচ্চবাচ্য শোনা যায়নি। এই ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে কেউ আশঙ্কা করতেই পারেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে মহিলাদের হেনস্থা করা, অথবা বিরোধী রাজনীতিকদের উপরে অহেতুক বলপ্রয়োগের ঘটনাগুলিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন দিল্লি পুলিশের উচ্চপদস্থরা প্রশ্রয়ের ভঙ্গিতেই দেখবেন। সেই সম্ভাব্য শিথিলতা ভবিষ্যতে আরও এমন অনেক লজ্জাজনক ঘটনার জন্ম দেবে, এই উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার কোনও উপায় নেই।
বিরোধীরা যে আন্দোলন করছেন, তা তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার— এ কথা মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানসূত্রে উপনীত হওয়াই এই ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ বিকল্প। কিন্তু আশঙ্কা হয় যে, সেই শিষ্টতা থেকে ভারত বহু দূরে সরে গিয়েছে। কিন্তু, অহিংস আন্দোলনের উপরে বলপ্রয়োগ, অথবা নিগ্রহ কোনও মতেই রাষ্ট্রের ন্যায্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে না। পুলিশকে এই কথা বারে বারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রশাসনের কর্তব্য।