সমাজমাধ্যম সংস্থা মেটা-র বিরুদ্ধে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে আগামী ছ’সপ্তাহ শুনানি চলবে। অভিযোগ, এগারো-বারো বছরের ছেলেমেয়েরা মেটা-র প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে আসক্ত হয়ে পড়ছে, এ কথা জেনেও সংস্থাটি নিষ্ক্রিয় ছিল। বস্তুত, তাদের আসক্তি যাতে প্রবলতর হয়, তার ব্যবস্থা করছিল। নিউ মেক্সিকোয় আরও একটি আদালত মেটাকে শিশুদের বিপন্ন করার জন্য প্রায় ষাট কোটি ডলার জরিমানা করেছে— এবং, সংস্থাটিকে সুস্থ জনজীবনের পক্ষে একটি আপদবিশেষ বলে অভিহিত করেছে। স্পষ্টতই, সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলিকে কী ভাবে দেখা হবে, সে প্রশ্নের উত্তর পাল্টাচ্ছে। সমাজমাধ্যমে আসক্তি যে কোনও ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব সমস্যা নয়, বরং তা রীতিমতো বাণিজ্যিক স্তরে পরিকল্পিত, এই কথাটি রাষ্ট্রীয় স্তরে স্বীকৃতি পাচ্ছে। ইনফিনিট স্ক্রল, অটোপ্লে, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট-বিন্যাস, বারংবার নোটিফিকেশন— গোটা ব্যবস্থাই যদি ব্যবহারকারীকে প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়, তবে ‘ব্যবহারকারী নিজেই দায়ী’ বলে দায় সেরে ফেলা চলে কি?
বিষয়টি মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড পাথওয়ে’-র সঙ্গে যুক্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক, মন্তব্য, নোটিফিকেশন, নতুন কনটেন্ট বা সামাজিক স্বীকৃতি— প্রত্যেকটি ব্যবহারকারীর প্রত্যাশা ও পুরস্কারের অনুভূতিকে সক্রিয় করে। বিশেষত অনিয়মিত, অনিশ্চিত পুরস্কার— পরের পোস্টটি ভাল হবে কি না, পরের নোটিফিকেশনটি কার, কত জন প্রতিক্রিয়া জানাল— পুনরাবৃত্ত আচরণকে শক্তিশালী করতে পারে। এমন আচরণগত আসক্তি এবং মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের পুরস্কার ও পুনর্বলন-ব্যবস্থার কিছু অভিন্ন প্রক্রিয়া কাজ করে। অতএব ‘আসক্তি’ শব্দটি এখানে নিছক অলঙ্কার নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, সংস্থাগুলি যদি এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানে, নিজেদের গবেষণায় তার ক্ষতিকর দিক দেখতে পায়, এবং তার পরেও ব্যবহারকারীর মনোযোগ আরও দীর্ঘ সময় ধরে রাখার জন্য একই নকশাকে পরিশীলিত করতে থাকে, তবে এই আসক্তির দায় এড়ানোর কোনও উপায় নেই।
কোনও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারী নিজের ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ হারালে তাঁরও দায় আছে; কিন্তু একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা যদি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করার ক্ষমতাকে তার আয়ের মূল ভিত্তি করে এবং সেই ক্ষমতা ব্যবহারের ফলে বৃহত্তর জনসমাজে ক্ষতির প্রমাণ মেলে, তবে সংস্থার দায়িত্ব অনস্বীকার্য। বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব আরও বেশি। সংস্থাগুলির শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ার ভরসায় থাকা যথেষ্ট নয়। যে ব্যবসার মুনাফার প্রধানতম ভিত্তি যত বেশি সম্ভব ব্যবহারকারীকে সেই প্ল্যাটফর্মে থাকতে বাধ্য করা, সে ব্যবসার কাছে স্বেচ্ছায় সংযমের প্রত্যাশা করা মুশকিল। তাই প্রয়োজন প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি— শিশুদের জন্য সুরক্ষা, ক্ষতিকর নকশা সম্পর্কে স্বচ্ছতা, স্বাধীন নিরীক্ষা, সংস্থার অভ্যন্তরীণ গবেষণায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রবেশাধিকার এবং কার্যকর ব্যবহারকারী-নিয়ন্ত্রণ। ব্যক্তির আচরণকে বিপুল পরিসরে প্রভাবিত করার প্রযুক্তি যদি বেসরকারি সংস্থার হাতে থাকে, তবে সেই ক্ষমতার সঙ্গে জনসমক্ষে জবাবদিহিও থাকতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ক্ষমতাকে আরও সূক্ষ্ম ও ব্যাপক করে তুলতে চলেছে। নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটির গুরুত্বও প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে।