রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি পেট্রলিয়াম আমদানি করে, এমন পাঁচটি দেশের ক্ষেত্রে আমেরিকায় পণ্য রফতানির উপরে একশো শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হোক, আমেরিকার সেনেটে আলোচ্য এই বিলটি নয়াদিল্লির কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলতে বাধ্য। দু’দেশের বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত কাঠামো আর এক সপ্তাহের মধ্যে রূপায়িত হওয়ার কথা। এই অবস্থায় এ-হেন একটি বিল আমেরিকার সেনেটে পাশ হলে ভারতের প্রথম কর্তব্য, বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে সেই শাস্তিমূলক শুল্ক থেকে নিজেদের নিষ্কৃতির ব্যবস্থা করা। অবশ্য, গত এক বছরে ভারত আমেরিকাকে যে পরিমাণ বাণিজ্যিক ছাড় দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, তাতে এই শুল্ক এড়ানোর জন্য নতুন ছাড়ের ব্যবস্থা করা কঠিন কাজ। শুধু আর্থিক বা বাণিজ্যিক প্রশ্নে নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। যদিও, সেনেটে প্রথমে যে বিলটি প্রস্তাবিত হয়েছিল, সেখানে ৫০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর দাবি ছিল। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, উভয় পক্ষের মোট ৬০ জন সেনেটরের আনা এই যৌথ বিলটি সেই অবাস্তব অবস্থান থেকে অন্তত আংশিক ভাবে সরেছে, চিন এবং ভারতের মতো দেশের পক্ষে তা আশার কথা। তবে, সমান রকম নয়। চিনের পক্ষে আমেরিকার সঙ্গে দরকষাকষি করার কাজটি যতখানি কঠিন, ভারতের পক্ষে তার বহু গুণ বেশি। কারণ সহজ— অর্থব্যবস্থার ওজন। ফলে, এই পরিস্থিতিতে ভারতকে প্রতিটি পা ভেবেচিন্তে ফেলতে হবে।
অন্তত অদূর ভবিষ্যতে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করা ভারতের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ সে অঞ্চল থেকে বৈশ্বিক তেল রফতানিকে বিপুল ভাবে ব্যাহত করেছে। সে সঙ্কটের প্রবল প্রভাব পড়েছে ভারতেও। রাশিয়া থেকে তেল আমদানিই এই মুহূর্তে ভারতের কাছে তেলের দামের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ঠেকানোর প্রকৃষ্টতম পন্থা। ফলে, অর্থব্যবস্থাকে সচল রাখার স্বার্থেই ভারতকে এই আমদানি চালিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হতে পারত এটাই যে, রাশিয়া-ভারত বাণিজ্য বিষয়ে কোনও কথা বলার অধিকার আমেরিকার থাকতে পারে না। কিন্তু, ট্রাম্প প্রশাসন এত দিনে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সেই দার্শনিক ভিত্তি এখন মূল্যহীন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নখদন্তহীন চেহারাটিও স্পষ্ট— আমেরিকার কোনও অন্যায়কে ঠেকানোই দৃশ্যত তার সাধ্যাতীত। ফলে, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি চালিয়ে যেতে হলে ভারতকে আমেরিকার থেকে ছাড়পত্র আদায় করতে হবে। এবং, চেষ্টা করতে হবে যাতে তার জন্য অন্য কোনও ভাবে খুব বড় কোনও মূল্য না দিতে হয়।
এ ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষে একটি সুসংবাদ হল, রাশিয়ার তেলের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থান বর্তমান সময়ে আমেরিকার পক্ষেও ইতিবাচক নয়। পশ্চিম এশিয়ায়, বিশেষত হরমুজ় প্রণালীকে ঘিরে, যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত, এই অবস্থায় রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে হলে বৈশ্বিক স্তরে মন্দা-পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে তার প্রভাব পড়বে আমেরিকার অর্থব্যবস্থার উপরেও। সে দেশের আইনসভা এখন সেই ঝুঁকি নেবে কি না, সে প্রশ্নটিই ভারতের মতো দেশের পক্ষে আলোর রেখা। এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্য চুক্তিতে আমেরিকার লাভের দিকগুলি ভারত কত ভাল ভাবে দেখাতে পারে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।