E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

অবহেলার বিষয়?

সরকারি কাজে প্রযুক্তিগত ত্রুটি পরিচিত সমস্যা। কিন্তু যেখানে বিষয়টি শিশুর খাবারের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে এই ত্রুটিকে কেন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করা গেল না? বরাদ্দ বৃদ্ধির ঘোষণার মধ্যে শুধুমাত্র চমকটুকুই থাকে।

শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:১৭

ধার করে ঘি খাওয়া নয়। মিড-ডে মিলে পড়ুয়ার পাতে ভাতের সঙ্গে সামান্য ডাল, তরকারিটুকু তুলে দিতেও সাম্প্রতিক কালে এই বঙ্গের অনেক স্কুলকে ধার করেই চালাতে হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন অবশ্য জানিয়েছেন, পোর্টালে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে বরাদ্দ-অর্থ পৌঁছতে দেরি হয়েছিল। সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। স্কুলগুলিতে টাকা পৌঁছে গিয়েছে। মন্ত্রিবর যে রকম বলেছেন, সমস্যাটি অবশ্য ততখানি সামান্য নয়। রাজ্যের বেশ কিছু সরকারপোষিত স্কুল ও মাদ্রাসায় এই বরাদ্দ পৌঁছয়নি প্রায় তিন মাস। ফলে, কোথাও সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে দ্বিপ্রাহরিক আহার, কোথাও দোকান থেকে ধারে জিনিসপত্র কিনতে হয়েছে। মিড-ডে মিলের চালটুকুই শুধুমাত্র স্কুলগুলি বিনামূল্যে পায়। বাকি আনাজ, তেল, মশলা-সহ সব কিছুই নগদে ক্রয় করতে হয়। ফলে, দোকান ধার দেওয়া বন্ধ করলে শিক্ষকরা নিজেদের টাকা দিয়ে প্রকল্পটি চালিয়েছেন। অর্থাৎ, শিশুর যে পুষ্টিবিধান প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল, তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অন্যের দয়ার দান। ভাতা পাননি না মিড-ডে মিলের কর্মীরাও। যাঁদের ভাতার পরিমাণ এমনিতেই যথেষ্ট কম, তাঁরা তিন মাস সেটুকু টাকাও না পেলে চালাবেন কী করে, সেটাও কি ভাবার কথা নয়?

সরকারি কাজে প্রযুক্তিগত ত্রুটি পরিচিত সমস্যা। কিন্তু যেখানে বিষয়টি শিশুর খাবারের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে এই ত্রুটিকে কেন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করা গেল না? বরাদ্দ বৃদ্ধির ঘোষণার মধ্যে শুধুমাত্র চমকটুকুই থাকে। কিন্তু এক কার্যকর ব্যবস্থাপনা দ্রুত গড়ে তাকে নির্ঝঞ্ঝাটে প্রাপকের হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে সরকারের প্রকৃত সদিচ্ছাটি প্রতিফলিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের দুর্ভাগ্য, এই দ্বিতীয় ক্ষেত্রটির পরিচয় এখনও সরকারি কাজেকর্মে বিশেষ পাওয়া গেল না। অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে মিড-ডে মিল অবধি সর্বত্র একই অব্যবস্থার চিত্র। হইচই, বিক্ষোভ হলে তবেই ত্রুটি মেরামতে নজর পড়ছে। নয়তো তিন মাসে যে ত্রুটির সমাধান হল না, সংবাদপত্রের পাতায় তা উঠে আসতেই সেই সমাধানসূত্র মেলে কোন জাদুমন্ত্রে? বাড়ন্ত শিশুর পুষ্টির বিষয়টি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তাতে আজ টান পড়লে, পরে সুদে-আসলে পুষিয়ে দেওয়া যায় না। শিক্ষক, সহানুভূতিশীল দোকানদারদের একাংশ তা উপলব্ধি করেছেন বলেই সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছেন। অথচ, প্রশাসন বুঝছে না।

মিড-ডে মিল শুধুমাত্র শিশুর পুষ্টিবিধানই করে না। শিশুর স্কুলে উপস্থিতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়া, এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণ এর বৃহত্তর উদ্দেশ্য। সেই কারণেই এই প্রকল্প যাতে ভাত-ডাল জোগানোর দায়সারা কার্যক্রমে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা সমস্ত সচেতন রাজ্য সরকারের কর্তব্য। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার হতশ্রী দশাটি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। রাজ্যের দুর্ভাগ্য, এই ক্ষেত্রটিই এক দীর্ঘ বঞ্চনার চিত্র হয়ে থেকে গিয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পরে মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই সংক্রান্ত সুব্যবস্থার ছবিটি সর্বক্ষেত্রে এখনও দেখা যায়নি। বরং, জেলায় কারা দায়িত্ব পাবে, কী ভাবে প্রকল্পটি চলবে, তাই নিয়ে একাধিক বার সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, মিড-ডে মিলের বিষয়টি তদারকি করছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। সেই জন্যই কি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলির আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন ছিল না? কেনই বা কিছু স্কুল বঞ্চিত থাকবে, অন্যরা সময়ে টাকা পাবে— এমন বৈষম্য-চিত্র তৈরি হবে? মিড-ডে মিল নিয়ে সমস্যা থাকলে প্রধান শিক্ষক তৎপর হবেন, অবশ্যই। কিন্তু তাতে সরকারের ভূমিকা এতটুকু কমে না। বরং রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ পড়ুয়া এখনও যে ব্যবস্থায় ভরসা রাখে, তার প্রতিটি ক্ষেত্র যাতে সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত হয়, কোনও বৈষম্য যেন তৈরি না হয়, তার উপর নজর রাখা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। প্রযুক্তিগত ত্রুটি এ ক্ষেত্রে কোনও অজুহাত হতে পারে না।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
mid-day meal mid-day meal scheme West Bengal government School students West Bengal Government School Government Schools

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy