E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

হাসপাতালের অসুখ

পরিবর্তে দেখা গেল, কোনও বিশেষ প্রমাণ ছাড়াই প্রশাসনের তরফে ধরে নেওয়া হল, মেডিক্যাল কলেজের মতো শীর্ষস্থানীয় (টার্শিয়ারি) হাসপাতালে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না। এতে কার্যত বেসরকারি হাসপাতালের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা হল।

শেষ আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২৫

শীর্ষস্তরের সরকারি হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের উপরে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গভীর অনাস্থা দেখা গেল। বিষয়টি ভাবিয়ে তোলার মতো। মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন চোরবাগান পুজো মণ্ডপে ভিড়ের চাপে আহতদের বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করল রাজ্যের বিজেপি সরকার। কেন এই সিদ্ধান্ত, সে প্রশ্নের উত্তরে কখনও জানা গেল, মেডিক্যাল কলেজের তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা উন্নত। কখনও শোনা গেল, বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল বলেই আহতরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। মেডিক্যাল কলেজের যে চিকিৎসকরা এ ভাবে রোগী স্থানান্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেন, তাঁদের ‘ছবি দেখে চিহ্নিত করা’-র জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশটিও আপত্তিকর। সব মিলিয়ে আহতদের চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে যা কিছু ঘটল, তাতে রাজ্যবাসীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা যেন কয়েক ধাপ বেড়ে গেল। কোন হাসপাতালে চিকিৎসা ভাল, সে বিষয়ে যে কোনও ব্যক্তির নিজস্ব অভিজ্ঞতা-প্রসূত মতামত থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোনও মন্ত্রী বা প্রশাসক এই ভাবে চিকিৎসাধীন রোগীর ভালমন্দ বিষয়ে নিজস্ব মত প্রকাশ করতে পারেন কি? ব্যক্তিগত ধারণার ভিত্তিতে একতরফা ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা কি সঙ্গত? এত গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শ মতোই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। সরকারি চিকিৎসা ও পরিচর্যায় কোথায় ফাঁক থেকে যাচ্ছে, বেসরকারি হাসপাতালে কোন বিশেষ সুবিধাগুলি পাওয়া যাবে, বিশেষজ্ঞরা খতিয়ে দেখে রোগী স্থানান্তরের পরামর্শ দিলে পুরো বিষয়টি বিধিসম্মত হত।

পরিবর্তে দেখা গেল, কোনও বিশেষ প্রমাণ ছাড়াই প্রশাসনের তরফে ধরে নেওয়া হল, মেডিক্যাল কলেজের মতো শীর্ষস্থানীয় (টার্শিয়ারি) হাসপাতালে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না। এতে কার্যত বেসরকারি হাসপাতালের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা হল। ফলত, বিষয়টি কেবল চোরবাগানে আহতদের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ রইল না। প্রশ্ন উঠল, তা হলে কি রোগীর চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালের উপর আস্থা রাখা যাবে না? জুনিয়র চিকিৎসকদের একাংশ সংবাদমাধ্যমের কাছে সেই প্রশ্নই তুলেছেন। সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলির পরিকাঠামোয় বহু ফাঁক রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। যথেষ্ট চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী নেই, স্বচ্ছ, তৎপর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেই। তার অন্যতম কারণ, সরকারি হাসপাতালগুলিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। শাসক দলের নেতা, স্বাস্থ্য আধিকারিক এবং কিছু চিকিৎসক-নেতার দাপটে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে উঠেছিল এ রাজ্যের হাসপাতালগুলির। আর জি কর কাণ্ড দেখিয়েছে, প্রতিটি ধাপে দুর্নীতি কত গভীর ও জটিল। পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন ছিল মেডিক্যাল কলেজগুলিকে স্বাতন্ত্র্য এবং স্বশাসন দেওয়া, তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ। সে দিকেই জুনিয়র চিকিৎসকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন, অথচ নতুন প্রশাসকরা তাতে বিরক্তি ও ক্রোধ প্রকাশ করছেন। সোজা কথা, চিকিৎসকদের মতকে গুরুত্ব না দিয়ে রোগীদের স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা বিপজ্জনক। প্রতিবাদী ডাক্তারদের চিহ্নিত করে শাস্তির ভয় দেখানো আরওই বিপজ্জনক। তবে কি ধরে নিতে হবে, রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসুখ বজায় রইল আগের মতোই?

প্রসঙ্গত, রাজ্যবাসীর নিশ্চয়ই স্মরণে আছে, পরিকাঠামো এবং কর্মী-সংখ্যায় বিপুল ঘাটতি সত্ত্বেও সরকারি হাসপাতালগুলিই কিন্তু দরজা খুলে রেখেছিল কোভিড-আক্রান্ত রোগীদের জন্য, যখন ‘উন্নত’ হাসপাতালগুলি দরজা বন্ধ রেখেছিল, অথবা প্রত্যাখ্যান করেছিল বহু রোগীকে। পেশাদারিত্বে, দক্ষতায় সরকারি চিকিৎসক, নার্সরা পিছিয়ে নেই, প্রমাণিত হয়েছিল। বহু অভাব, অনিয়ম সত্ত্বেও সরকারি হাসপাতাল, বিশেষত মেডিক্যাল কলেজগুলিই রাজ্যের অধিকাংশ মানুষের ভরসাস্থল। সেই ভরসাকে আরও গভীর করাই রাজ্য প্রশাসনের কাজ।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Stampede private hospitals Government hospitals West Bengal government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy