E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

প্রশ্নাতীত

সমাজমাধ্যম এমনই এক ক্ষেত্র, যেখানে ব্যবহারকারীর মন্তব্য অনেক সময় রীতিসিদ্ধ শিষ্টতার সীমা ছাড়ায়। সেটা অবশ্যই নিন্দনীয়। তবে, শিষ্টতার সংজ্ঞা কী, কে তা নির্ণয় করছে, সেই নির্ণয়ে কতটা নির্মোহ বিচার অথবা পক্ষপাত জড়িয়ে, সেও এক জরুরি প্রশ্ন।

শেষ আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ০৪:২৫

গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা অপরাধ নয়, নাগরিকের অধিকার— প্রশাসন তা কবে বুঝবে? ব্যাপকার্থে এ যে ভারতের সংবিধান-স্বীকৃত বাক্‌স্বাধীনতারও অধিকার, তা-ই বা আর কত বার, কত ভাবে বোঝাতে হবে? এ কথা ঠিক যে, সমাজমাধ্যম-প্রভাবিত এই যুগে ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম এক্স ইত্যাদি পরিসরে কে কখন কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু লিখছেন কিংবা শেয়ার বা ফরোয়ার্ড করছেন, তার অনুপুঙ্খ যাচাই কঠিন। কিন্তু তা যাচাইয়ের পিছনে এই বোধটি থাকা প্রয়োজন, আখেরে তা কি কারও ক্ষতি করছে? জীবন বা নিরাপত্তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? উত্তরটি যদি ‘না’ হয়, তা হলে সমাজমাধ্যমে বা তার বাইরেও বিরুদ্ধ স্বর, উষ্মাময় উচ্চারণকে এড়িয়ে গেলেই চলে— তার জন্য মানুষটিকে গ্রেফতার করা চলে কি? পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু গ্রেফতারি সেই প্রশ্নই ফের সামনে এনেছে। সমাজমাধ্যমে সরকারের ‘সমালোচনা’ করে পোস্ট করার অভিযোগে কয়েক জনের গ্রেফতারির ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের। রাজনৈতিক বক্তব্য বা পোস্টের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ, মামলা, পুলিশি হেফাজত— সবই হয়েছে। কেউ ব্যক্তিগত বন্ডে সই করে মুক্তি পেয়েছেন, কেউ পুলিশি হেফাজতে কমবেশি সময় পেরিয়ে তবেই।

অভিযোগের সত্যতা, আদালতের পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি বিচারাধীন বিষয়; কিন্তু প্রশ্নটি বৃহত্তর। সরকারের ‘বিরোধিতা’ করলেই, এমনকি সমাজমাধ্যমে শাসক দল ও তার পরিচালিত প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপ্রিয় কিছু লিখলেই যদি সরকার-বিরোধিতা ও বৃহদর্থে রাষ্ট্রবিরোধিতার তকমা এঁটে যায়— যদি গ্রেফতারি, মামলা থেকে শুরু করে দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে নাগরিককে পড়তে হয়, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো শব্দগুলি তা হলে অর্থহীন হয়ে পড়ে। তৃণমূল জমানায় অম্বিকেশ মহাপাত্রের কার্টুন-সংক্রান্ত মামলার স্মৃতি এখনও মোছেনি; তার পর দীর্ঘ আইনি লড়াই ও নাগরিকের হয়রানি দেখিয়েছে, ক্ষমতার সমালোচনাকে অপরাধের চোখে দেখার প্রবণতা কতটা বিপজ্জনক। তৃণমূল আমলে সাধারণ ভাবে বিরোধী মতের মানুষের পুলিশি হয়রানি ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ কম নয়; সেই অভিজ্ঞতার অবসান হবে, ক্ষমতায় আসার আগে এই প্রতিশ্রুতি বিজেপি দিয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকারে ছয় মাস পেরোতে না পেরোতেই তার প্রাক্তনের অসহিষ্ণুতার ‘ঐতিহ্য’-সীমা ও পরিধি যে ভাবে ধারে ভারে বাড়িয়ে তুলেছে, তা অতি দুর্ভাগ্যের ও উদ্বেগের।

সমাজমাধ্যম এমনই এক ক্ষেত্র, যেখানে ব্যবহারকারীর মন্তব্য অনেক সময় রীতিসিদ্ধ শিষ্টতার সীমা ছাড়ায়। সেটা অবশ্যই নিন্দনীয়। তবে, শিষ্টতার সংজ্ঞা কী, কে তা নির্ণয় করছে, সেই নির্ণয়ে কতটা নির্মোহ বিচার অথবা পক্ষপাত জড়িয়ে, সেও এক জরুরি প্রশ্ন। সব দেশেই, শাসক বা বিরোধী যে কোনও রাজনৈতিক দল বা সরকার সম্পর্কেও নাগরিকেরা সমাজমাধ্যমে তাঁদের ক্ষোভ রাগ আক্ষেপ ও ব্যঙ্গ উগরে দেন; পরিচিত বা বিখ্যাত নেতা, মন্ত্রী, এমনকি রাজ্য বা রাষ্ট্রের প্রধানরাও বাদ যান না। এই রাগ বা ব্যঙ্গ যে দিনের শেষে নাগরিকের আশাহীনতা বা স্বপ্নভঙ্গেরই দ্যোতক, তা বোঝা কি খুব কঠিন? বরং এর পাল্টা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক ও প্রচারযন্ত্র যে উগ্রতা ও হিংসা নিয়ে নেমে পড়ে, তা অনেক বেশি ভয়ের। সমাজমাধ্যমে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণেই তা সীমিত থাকলে তবু কথা ছিল, পুলিশ যদি সমাজমাধ্যমের পোস্ট টেনে নাগরিককে গ্রেফতার করে, তাকে হেনস্থা বা উৎপীড়ন করে, তবে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়। ইতিহাসের শিক্ষা কিন্তু স্পষ্ট: দমন-পীড়ন দিয়ে কোনও মতকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না। আজ নাগরিকের প্রতিবাদের পন্থা বদলেছে, কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার বদলায়নি। নাগরিকের রাজনৈতিক অসন্তোষকে ‘অপরাধ’-এ পরিণত করার অধিকারও সরকারের নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এবং সেটা গোড়ার কথাও— যে গণতন্ত্রে নাগরিক নির্ভয়ে কোনও প্রশ্ন করতে পারেন না, তা কি আদৌ গণতন্ত্র?

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Indian Democracy Democracy Human Rights Fundamental Rights

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy