E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বিপদের রাজধানী

বৃষ্টির রাতে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার অছিলায় কিশোরীকে ফাঁকা বাসে তুলেছিল চালক ও কন্ডাক্টর। বিলাসবহুল বাসের জানলায় পর্দার সুবিধা নিয়েই গ্রেটার নয়ডার পরি চক থেকে দিল্লির কাশ্মীরি গেট পর্যন্ত প্রায় ৪৭ কিলোমিটার রাস্তায় ওই কিশোরীকে তারা নির্যাতন করে বলে অভিযোগ।

শেষ আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:২৪

চোদ্দো বছর আগে দিল্লির বাসে গণধর্ষণের ঘটনা ভারতের ইতিহাসে চিরকালীন ক্ষত, যার যন্ত্রণা এখনও দেশ বয়ে চলেছে। সেই আতঙ্ক যে আবারও সদর্পে হাজির— তা একই সঙ্গে উদ্বেগের ও লজ্জার। ২০১২-র দিল্লির গণধর্ষণ কাণ্ডের মূলে সমাজের যে রোগ, তার নিরাময় অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ, সম্ভবত শতাব্দীকালও কম পড়বে। কথাটি জানা বলেই প্রথম প্রশ্ন উঠেছিল, এমন অপরাধের পথরোধ করার জন্য কী কী করতে হবে। বদলেছিল আইন, তৈরি হয়েছিল একের পর এক নিরাপত্তাবিধি, বলা হয়েছিল গণপরিবহণে নজরদারি বাড়বে, চালক-কন্ডাক্টরের পরিচয় যাচাই হবে, বাসে সিসিটিভি ও অবস্থান-নির্ণায়ক ব্যবস্থা থাকবে, যাত্রী প্যানিক বাটনের সহায়তা পাবেন, জানলায় কালো কাচ বা পর্দা নিষিদ্ধ। কিন্তু ২০২৬-এর স্বাধীনতার মাসের ঘটনা সকল প্রতিশ্রুতির অন্তঃসারশূন্যতার অকাট্য প্রমাণ।

বৃষ্টির রাতে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার অছিলায় কিশোরীকে ফাঁকা বাসে তুলেছিল চালক ও কন্ডাক্টর। বিলাসবহুল বাসের জানলায় পর্দার সুবিধা নিয়েই গ্রেটার নয়ডার পরি চক থেকে দিল্লির কাশ্মীরি গেট পর্যন্ত প্রায় ৪৭ কিলোমিটার রাস্তায় ওই কিশোরীকে তারা নির্যাতন করে বলে অভিযোগ। এত দীর্ঘ পথে বাসটি কোথাও পুলিশের নজরে পড়েনি, অথচ আগেই বাসটির বিরুদ্ধে একাধিক ট্র্যাফিক আইনভঙ্গের অভিযোগ ছিল, মোটা পর্দা তো ছিলই, সিসিটিভিও কার্যকর ছিল না। বোঝাই যাচ্ছে, প্রস্তাবিত সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি ধাপও মানা হয়নি। অনিয়মগুলি আগে ধরা গেলে এত বড় ঘটনা কি ঘটত? পরিবেশ যে আবারও পঙ্কিল তারও যথেষ্ট পূর্বলক্ষণ ছিল। মাত্র মে মাসেই দিল্লির রানিবাগ এলাকায় বাসে এক ৩০ বছরের মহিলাকে গণধর্ষণের অনুরূপ অভিযোগ উঠেছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর, পর্দা বা কালো ফিল্ম লাগানোর আইনি নিষেধাজ্ঞা এত বছর পরেও বলবৎ নয়। যাত্রীদের ব্যক্তিগত পরিসরের অজুহাতে তা রয়েই গিয়েছে, আর বার বার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। দেখা যাচ্ছে, কিছু দিন চলে ধরপাকড়, হুঁশিয়ারি, পরিদর্শন, তার পর আবার শৈথিল্য। এটিই অলিখিত নিয়ম। অতএব, জানা প্রয়োজন, পর্দা বা প্যানিক বাটন— নিরাপত্তা-সরঞ্জামগুলি লোকদেখানো নাকি কার্যকর, তা যাচাই করার ব্যবস্থা ঠিক কী? নির্দিষ্ট বিভাগ বা ব্যক্তির উপর এই তদারকির ভার জবাবদিহি-সহ ন্যস্ত না করলে এই বিচ্যুতি রোখা অসম্ভব।

খাস রাজধানীতে, যেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, সুবিশাল পরিবহণ প্রশাসন ও বিপুল পুলিশ কাঠামো, যদি একটি কিশোরীকে এত দূর নিয়ে যাওয়া যায়, কেউ জানতেই না পারেন, তবে ছোট শহর, গ্রামাঞ্চলের গণপরিসরের ভয়াবহতা তো সহজেই অনুমেয়। সরকারি পরিসংখ্যানেই তার প্রতিফলন বিচলিত করে। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর ২০২৩-এর হিসাবে, দেশে নারীর বিরুদ্ধে মোট ৪,৪৮,২১১টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের (৪,৪৫,২৫৬টি) চেয়ে বেড়েছে। বহু বাধা পেরিয়ে, ধর্ষণের নথিভুক্ত হতে-পারা মামলাই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮১টি। অতএব, রাজধানীর নিরাপত্তার শোচনীয় ব্যর্থতা গোটা দেশের সঙ্গিন অবস্থারই দগদগে প্রতীক। ২০১২-য় যে প্রশ্নটি উঠেছিল, তার উত্তর এখনও মেলেনি। নারীকে নিরাপদ রাখতে এমন ব্যবস্থা কি কখনও তৈরি হবে, যা নিয়ম ভাঙার তিলমাত্র সুযোগও দেবে না?

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Sexual Harassment Teenager Greater Noida

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy