E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

মেয়েদের কাজ

চারটি নয়া শ্রম বিধি সারা দেশে চালু হয়েছে। আগের আইনগুলির মতো, নয়া বিধিতেও নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ, সমান কাজের জন্য সকলকে সমান মজুরি দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু, যদি না উপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, এই নিয়ম কার্যকর করা অসম্ভব।

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ০৭:১৬

ভারতের সংগঠিত ক্ষেত্রে মেয়েদের উপস্থিতি কমছে। জাতীয় স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত ২৬৪৭টি বাণিজ্যিক সংস্থার প্রায় অর্ধেক সংস্থায় দায়িত্বপূর্ণ আধিকারিকদের পদে কোনও মহিলা নেই। নেতৃত্বের স্থানে একাধিক মহিলা রয়েছেন, এমন সংস্থা মাত্র ১০ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি ক্ষেত্রে নতুন নিযুক্তির ৩৩ শতাংশ মহিলা। যাঁরা টিকে যান, তাঁদের অধিকাংশই নীচের স্তরে, তুলনায় স্বল্প বেতনের কাজগুলি করেন। আঠারো হাজার টাকার বেশি বেতনে কর্মরতদের মধ্যে মেয়েদের অনুপাত ২০২০-২১’এও ছিল ২১%, ২০২৪-২৫’এ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২%। তার চেয়ে কম বেতনে কর্মরতদের মধ্যে মেয়েদের হার ওই সময়কালে ১৯% থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩%। কিন্তু মোটের উপরে ওই সময়কালে সংগঠিত ক্ষেত্রে মেয়েদের সংখ্যা এক শতাংশ-বিন্দু কমে দাঁড়িয়েছে ১৮%। এই ছবি উদ্বেগজনক। ভারতে আজ স্নাতক-উত্তীর্ণদের প্রায় অর্ধেকই মেয়ে, উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের উপস্থিতি বাড়ছে। তা হলে সংগঠিত ক্ষেত্রের চাকরি, বিশেষত দায়িত্বপূর্ণ পদ, উচ্চবেতনের কাজগুলি কেন মেয়েদের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে? এমনকি, মেয়েদের সংখ্যা কমছে কেন? এই প্রশ্নগুলি সহজে সামনে আনতে চায় না সরকার বা শিল্পমহল, কোনও পক্ষই। বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরতদের একটা বড় অংশকে ‘ইপিএফ’-এ নথিভুক্ত করছে নিয়োগকারীরা। তাই তাঁরা সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী বলে গণ্য হচ্ছেন সরকারের নথিতে। বস্তুত কাজের শর্ত, সময়সীমা, নিরাপত্তা প্রভৃতির বিচারে তাঁদের অবস্থা অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের থেকে আলাদা নয়। এই সঙ্কটের মুখোমুখি লিঙ্গ-নির্বিশেষে সব কর্মী, কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে যুক্ত হয় বৈষম্য, বঞ্চনা, অবমাননার বাড়তি মাত্রা।

চারটি নয়া শ্রম বিধি সারা দেশে চালু হয়েছে। আগের আইনগুলির মতো, নয়া বিধিতেও নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ, সমান কাজের জন্য সকলকে সমান মজুরি দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু, যদি না উপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, এই নিয়ম কার্যকর করা অসম্ভব। সেই বিধিব্যবস্থার প্রয়োজন তীব্র— নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন এমন মহিলাকর্মীদের ৫৭ শতাংশের কোনও লিখিত নিয়োগপত্র নেই। পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা মাসে গড়ে ৫৬৬৪ টাকা কম পান। স্নাতকোত্তীর্ণ মেয়েদের নিয়োগ করছে যে সব ক্ষেত্র— প্রধানত তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য— সর্বত্র এই ছবি দেখা যাচ্ছে। নানা সমীক্ষা দেখিয়েছে যে, সম্মানজনক পদ ও বেতন পাওয়ার আশা না থাকায় বহু উচ্চশিক্ষিত মেয়ে রোজগারের চেষ্টা ছেড়ে বেতনহীন গৃহকাজ বেছে নিচ্ছেন, যা মানবসম্পদের অপচয়। স্বল্পবিত্ত পরিবারগুলিতেও এই বৈষম্য প্রকাশ পাচ্ছে। আজ়িম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রিপোর্ট (স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া, ২০২৬) দেখাচ্ছে, ২০-২৯ বছরের পুরুষদের মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে নিয়োগ যেখানে ক্রমাগত কমছে, সেখানে ওই বয়সের মহিলাদের মধ্যে কৃষিতে নিযুক্তির হার ২০১১ অবধি কমার পরে আবার বাড়তে শুরু করেছে। যার অর্থ, শ্রমজীবী তরুণীরা শিল্প-পরিষেবা ক্ষেত্রে যথেষ্ট কাজ পাচ্ছেন না।

বিষয়টি কেবল অর্থনীতির নয়, রাজনীতিরও। লিঙ্গবৈষম্য ভারতে সম্পদ-বঞ্চনার অন্যতম অক্ষ— জাতপাত ও আর্থিক শ্রেণির মতোই। সরকারি ক্ষেত্রেও মহিলাকর্মীদের প্রতি এই বৈষম্য পুরোমাত্রায়— সরকারি হাসপাতালের নার্স বা আশা-অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের বেতন-কাঠামো দেখলেই স্পষ্ট হয় দায়িত্ব, দক্ষতা বা শ্রমের সঙ্গে বেতনের সামঞ্জস্য নেই, সম্পর্ক রয়েছে লিঙ্গপরিচয়ের সঙ্গে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, বেতনহীন গৃহকাজ, স্বনিযুক্ত ব্যবসায়ী, খেতমজুর, ঠিকা-মজুর মেয়েদের সংখ্যা দেখিয়ে শ্রমবাহিনীতে মেয়েদের অংশীদারি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা অর্থহীন। তা উন্নয়নের দ্যোতক নয়। সরকারি ও বেসরকারি, দু’ক্ষেত্রেই শিক্ষিত, দক্ষ মেয়েদের জন্য উপযুক্ত কাজ তৈরি করতে হবে, দিতে হবে বৈষম্যহীন কর্মস্থল, যথাযোগ্য বেতন।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Women employee Corporate Sectors Central Government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy