E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

হাতে হাত

সমস্যা হল, বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সামাজিক মেলামেশার পরিসরটি এখন অনেকখানি কমে এসেছে অল্পবয়সিদের ক্ষেত্রে। অণু পরিবারের সৃষ্টি তাদের গোড়াতেই ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলে।

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৪৯

রক্তে চিনির মাত্রা বিপজ্জনক বলে উৎসবের দিনে মিষ্টিমুখ করা থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকবে, এমন স্বাস্থ্যসচেতন বাঙালি এখনও হয়ে উঠতে পারেনি। চিকিৎসকরাও সচরাচর এমন দিনে একটু-আধটু ছাড় দিয়েই থাকেন। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, কেউ যদি প্রিয় সঙ্গীর সঙ্গে বসে খান, তবে খাওয়ার পর তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা অনেকখানি কম থাকবে একলা-খাইয়েদের চেয়ে। হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুসালেম-এর গবেষকরা গবেষণাটি চালিয়েছিলেন ৫৪টি যুগল, অর্থাৎ ১০৮ জন অংশগ্রহণকারীর উপর। দেখা গিয়েছে, যাঁরা একলা খেয়েছেন, তাঁদের তুলনায় যাঁরা সঙ্গীর সঙ্গে বসে একটি স্বাভাবিক পরিপূর্ণ আহার গ্রহণ করেছেন, তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা ঘণ্টাদুয়েক পর ১৫ শতাংশ কমেছে। তাই, ব্লাড শুগারের ভয়ে যাঁরা প্রতিটি খাবার হিসাব কষে খান, বা অতি বেপরোয়া যাঁরা হামেশাই বাড়ি ঢোকার আগে পাড়ার দোকানে দাঁড়িয়ে টুক করে মুখে সন্দেশ, ক্ষীরকদমটি ফেলে শুগার সংক্রান্ত পারিবারিক অশান্তি এড়াতে চান, তাঁদের উদ্দেশে এমন বার্তা দেওয়াই যায়— মনের মানুষের সঙ্গে ফুরফুরে মনে আহারের অভ্যাস করুন, রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।

এর একটি চমৎকার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন গবেষকরা— ‘সোশ্যাল ফিজ়িয়োলজি’। জীবনধারার বিজ্ঞান অনুযায়ী, মানুষ সর্বদা তার ঘনিষ্ঠ বৃত্তটি খুঁজে নিতে চায়। সেই ঘনিষ্ঠতা নিছকই অবসরযাপন নয়, এর মনস্তাত্ত্বিক উপযোগিতার পাশাপাশি শারীরবৃত্তীয় উপযোগিতাটিও যথেষ্ট বেশি। ঠিক এই কারণেই বিশ্ব জুড়ে একাকিত্ব বিষয়ে আলোচনা এত গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতিপূর্বে বহু পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, সামাজিক বন্ধন যত দৃঢ় হবে, পারস্পরিক সংযোগ যত বৃদ্ধি পাবে, শারীরিক ও মানসিক ভাবে ‘ভাল থাকা’র পরিসরটিও তত বিস্তৃত হবে। এর বিপরীতে, যাঁরা সমাজবিচ্ছিন্ন থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্যানসার, হার্টের অসুখ, ক্ষত নিরাময়ে দেরি, ঘুমে ব্যাঘাতের মতো জটিল অসুখের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। ঠিক একই পথে গবেষকরা ৫৬টি মা-শিশুর জুটি এবং ৫৭টি প্রাপ্তবয়স্ক যুগলের উপরে গবেষণা করে দেখেছেন, সামাজিক সান্নিধ্য শারীরবৃত্তীয় উৎকণ্ঠাকেও হ্রাস করে। কেন জন্মের পর শিশুকে দ্রুত মায়ের কাছে নিয়ে আসার বিষয়ে এত জোর দেন চিকিৎসকেরা, তার কারণটি বুঝতে অসুবিধা হয় না।

সমস্যা হল, বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সামাজিক মেলামেশার পরিসরটি এখন অনেকখানি কমে এসেছে অল্পবয়সিদের ক্ষেত্রে। অণু পরিবারের সৃষ্টি তাদের গোড়াতেই ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলে। অন্য দিকে, মোবাইলের সহজলভ্যতা তাদের বন্ধুবৃত্তটিকেও ছোট করে ফেলে। খেলার মাঠে, বাড়ির ছাদে সমবয়সিদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ ক্রমেই হারাচ্ছে নবীন প্রজন্ম। এই রোগ নির্ধারণে কোনও গবেষণার প্রয়োজন হয় না। চার পাশে তাকালেই ছোটদের মধ্যে মনঃসংযোগের সমস্যা, অল্পতেই মেজাজ হারানো, নিজেকে গুটিয়ে রাখার মতো হরেক লক্ষণ চোখে পড়ে। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবটিতে কিন্তু এই সকল রোগের অব্যর্থ ওষুধটি মজুত। এক সঙ্গে দিন-রাত জাগা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, পঙ্‌ক্তিভোজন, পারস্পরিক সৌহার্দ বিনিময়— সব বয়সের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত মেরামতের সেরা সময়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Research

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy