নিজের ব্যক্তিসত্তার বাইরে, নিজের পরিবারের বাইরে কী কারণে মানুষ কাউকে আপন ভাবে, কারও সঙ্গে যূথবদ্ধ হতে চায়? যখন সেই ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠীর সঙ্গে সে নিজের মিল খুঁজে পায়। সে মিল যেমন ভাষাগত, বা বর্ণগত হতে পারে, তেমনই হতে পারে অভ্যাসের, বিশ্বাসের, জীবনযাপনের। ছোট দল থেকে অতিবৃহৎ রাষ্ট্র, সবই গঠিত হয়েছে এই ‘কল্পিত গোষ্ঠী’র সূত্র অনুসরণ করে। তবে, এই প্রথম, একটি বৈশ্বিক পরিচিতি তৈরি হচ্ছে, যার ভিত্তি হল জন্মের সময়কাল। ১৯৯৭ থেকে ২০১০, এই বছরগুলির মধ্যে যাদের জন্ম, তারা নিজেদের জেন জ়ি হিসাবে চেনে, এবং চেনাতে চায়। তাদের আত্মপরিচিতিতে দেশের গণ্ডি নেই— তারা ডিজিটাল দুনিয়ার নাগরিক। এই প্রথম প্রজন্ম, যাদের জন্মই হয়েছে মোবাইল ফোন হাতে। ইন্টারনেট-পূর্ব দুনিয়ায় যে সাংস্কৃতিক চিহ্নকগুলি মানুষের আত্মপরিচয় গঠনের উপাদান ছিল, বাধ্যতামূলক ভাবেই তা ছিল স্থানীয়। ইন্টারনেট সেই সীমাবদ্ধতা দূর করেছে। ফলে, নিতান্ত শৈশব থেকে এই প্রজন্ম অভ্যস্ত হয়েছে এক সমস্বত্ব বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে। স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে পরে— উপরিভাগে। জেন জ়ি-র একটি নিজস্ব বৈশ্বিক বাক্ভঙ্গি রয়েছে, কিন্তু সেটুকুই নয়। পাশাপাশি রয়েছে কিছু সর্বজনীন বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিশ্বাসও। একাত্ম বোধ করার জন্য এই উপাদানগুলি জরুরি। এবং, এই প্রজন্মের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এক ধরনের আন্তর্জাতিকতাবাদও— যেখানে জাতীয় সীমান্ত মানুষের অস্তিত্বকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না; সংস্কৃতি, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ইত্যাদির সূত্রে সংযুক্ত হতে থাকে সমগ্র বিশ্ব। এই প্রজন্ম জাতীয়তাকে অস্বীকার করে না, কিন্তু একই সঙ্গে তাকেই শেষ কথা বলেও স্বীকার করে না।
পূর্ববর্তী প্রজন্ম এই জেন জ়ি-কে চিহ্নিত করেছিল বিচ্ছিন্নতার বৈশিষ্ট্যে— বলেছিল, সম্পূর্ণ ডিজিটাল জীবনযাপন তাদের পরিণত করেছে পারস্পরিক সম্পর্কহীন একক অস্তিত্বে। গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটা জেন জ়ি বিপ্লব প্রমাণ করেছে, প্রয়োজন পড়লে তারা সেই বিচ্ছিন্ন ‘অ-সামাজিক’ অস্তিত্ব থেকে বেরিয়ে পরস্পরের পাশে দাঁড়াতেও পারে। প্রশ্ন হল, এই দু’টি বৈশিষ্ট্য কি পরস্পর-বিপরীত, না কি তা একই সত্তার দু’ধরনের প্রকাশ? পূর্বজদের পক্ষে এই প্রজন্মকে বোঝার সম্ভবত সবচেয়ে বড় বাধা, ‘ডিজিটাল নেটিভ’-দের দুনিয়া সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা না থাকা। বিবর্তনের ইতিহাস বলবে, মানুষ প্রশ্নাতীত ভাবে সমাজবদ্ধ জীব, কিন্তু সেই বন্ধনের চরিত্রটি পরিবর্তনশীল। ইন্টারনেটের দুনিয়া যে বন্ধন তৈরি করেছে, তা নিশ্চিত ভাবেই পূর্ববর্তী সমাজভাবনার চেয়ে পৃথক। কিন্তু, পরিচিতির মাধ্যমে গোষ্ঠীবদ্ধতার যে সম্পর্ক এই দুনিয়ার নাগরিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তা পৃথক বলেই লঘু, এই অনুমানটির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। সমাজবদ্ধতার মূল প্রশ্ন, অপরের প্রয়োজনটিকে নিজের অন্তরে অনুভব করা। সে অনুভূতি বাহ্যিক নৈকট্যের কারণে তৈরি হচ্ছে, না কি তা অন্তর্জালবাহিত, সে প্রশ্ন সম্ভবত গৌণ। জেন জ়ি বিপ্লব অন্তত এই সংশয়ের পরিসর তৈরি করে দিতে পেরেছে।
একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী হিসাবে জেন জ়ি-র উত্থান এত দিনে প্রশ্নাতীত। তার রাজনৈতিক তাৎপর্য কতখানি সুদূরপ্রসারী, এই মুহূর্তে সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বিশেষত ভারতের মতো দেশে, যেখানে রাজনীতির মধ্যে বিবিধ পরিচিতির অক্ষ অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিচিতির রাজনীতি— তা জাতিভিত্তিক হোক, ভাষা বা অঞ্চলভিত্তিক হোক, অথবা ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক— তার মূল চালিকাশক্তি সেই পরিচিতি বহনকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে গোষ্ঠীগত একতা; এবং অ-পর গোষ্ঠীর প্রতি বিরোধিতা, ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্বেষও। কী ভাবে নতুন পরিচিতির রাজনীতি তৈরি হয়, কী ভাবে তা পুরনো রাজনীতিকে চ্যুত করে ক্রমশ মূলধারায় উঠে আসে, আধুনিক ভারতের ইতিহাস তা বহু বার প্রত্যক্ষ করেছে। জেন জ়ি-র রাজনৈতিক অবস্থানটিও নিঃসন্দেহে পরিচিতিভিত্তিক। কিন্তু, সেই পরিচিতি ভারতের এতদিনকার পরিচিতির অক্ষগুলির থেকে যে পৃথক, শুধু তা-ই নয়— বহু ক্ষেত্রেই তা সেই পুরনো পরিচিতির অক্ষগুলিকে ভেঙে এগিয়ে চলে। ফলে, জেন জ়ি যদি আজকের চেহারায় ভবিষ্যতের রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে, ভারতীয় রাজনীতির চলন আরও এক বার পাল্টাতে পারে। কিন্তু, পুরনো পরিচিতিগুলিও কম শক্তিশালী নয়। ফলে, সেগুলিও জেন জ়ি-র পরিচিতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। এই টানাপড়েন নিশ্চিত ভাবেই তৈরি করবে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ।