দশম শ্রেণির পড়ুয়াদের অনেকেই ‘রিডিং’ পড়তে পারে না।
সঠিক উত্তর বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র দেখেও খাতায় বানান ভুল লেখে অনেকে।
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরের অধিকাংশ পড়ুয়ারা ৭০ শব্দের বেশি কিছুই লিখতে পারে না। লিখলেও বানান-ব্যাকরণে হাজার হাজার ভুল...
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এমনই অভিজ্ঞতা শিক্ষকদের। কোথায় থেকে গিয়েছে খামতি, ধরতে পারছেন না তাঁরা।
কিন্তু কেন এমন অবস্থা?
শিক্ষকদের একাংশ সরাসরি আঙুল তুলছেন বিগত এক দশকের শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক অবনমনের দিকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারি বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৌগত বসু জানান, মূলত তিনটি কারণের জন্য এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। দশম শ্রেণির অনেক পড়ুয়া কোনও গল্পের বই বা সংবাদপত্র তো দূরের কথা বাংলায় লেখা পাঠ্যবই ‘রিডিং’ পড়তে পারে না। নিজেরা লিখতেও পারে না। এমন অনেকে থাকে, যা প্রশ্নপত্রে দেওয়া উত্তরের মধ্যে থেকে বেছে নিয়েই লিখতে হয়। সেখানেও দেখা যায় বানান ভুল।
সৌগত বসুর মতে, এই অবস্থার জন্য তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, ২০২০ সালে কোভিড অতিমারির পর থেকে শিক্ষাপদ্ধতিতে যে পরিবর্তন, অনলাইন নির্ভরতা বৃদ্ধি— তা সার্বিক ভাবে পঠনপাঠনের ক্ষতি করেছে। প্রায় দু’বছর পড়ুয়াদের সরাসরি পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। এরই সঙ্গে যুক্ত হয় নম্বর পাইয়ে দেওয়ার প্রবণতা। অভিভাবক এবং পড়ুয়াদের মধ্যে নম্বর অর্জনের থেকে নম্বর পাওয়ার চাহিদা বড় হয়ে ওঠে। এই মানসিকতা সার্বিক ভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি করেছে বলে তাঁর দাবি।
আরও পড়ুন:
পাশাপাশি পরীক্ষা পদ্ধতির বদল নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সৌগত। তাঁর দাবি, একাদশ ও দ্বাদশের দ্বিতীয় ও চতুর্থ সেমেস্টারের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় ৩০-এর মধ্যে ২৯-৩০ নম্বর পাওয়া যেন পড়ুয়াদের অধিকারে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ স্কুলও কার্যত সেই পথেই যায়, নিজেদের কৃতিত্ব প্রমাণের তাগিদে। এর ফলে লিখিত পরীক্ষায় ভাল ফল করার প্রয়োজন হয় না। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শিক্ষার অবনমন রোধ করা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
২০২৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার ইতিহাসের খাতা দেখেছেন এমন এক শিক্ষক দাবি করেন, “১০০ শব্দে কোনও বিষয় ছাত্রছাত্রীরা যা লিখেছে তা উদ্ধার করতে গিয়ে আমার কাল ঘাম ছুটে গিয়েছিল। সঠিক উত্তর বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বানান ভুল করেছে।”
স্কুল স্তরের এই চিত্রেরই প্রভাব পড়ছে উচ্চশিক্ষাতেও! কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাগরময় ঘোষ জানান, সাম্মানিক স্নাতক স্তরের বহু পড়ুয়াও ৬০-৭০ শব্দের বেশি লিখতে পারছেন না। লেখার অভ্যাস পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এর কারণ হিসেবে তাঁর মত, স্কুল স্তর থেকেই যে মূল্যায়ন ও প্রশ্নপত্রের ধাঁচের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা পরিচিত সেখানে লেখার ক্ষমতাই তাঁরা হারিয়ে ফেলেছেন।
এই ব্যবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাগরময় ঘোষ বলেন, “পড়ুয়ারা কী জানে তার মূল্যায়ন হয় বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থায়, কী বোঝে তার কোনও মূল্যায়ন হয় না। সে কারণে কোনও জটিল সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে ছাত্রছাত্রীরা পেরে উঠছেন না।” তাঁর দাবি, অতিরিক্ত ‘এমসিকিউ’ প্রশ্নোত্তরের নির্ভরতা এবং স্কুল স্তরে ভাষা ও ব্যাকরণের প্রতি আগ্রহ না থাকায় লেখার মাধ্যমে মনের ভাবে ছাত্রছাত্রীরা প্রকাশ করতে পারছেন না। তাই একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে বিষয়টিতে নজর দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
প্রশ্ন উঠেছে স্কুল স্তরে কি প্রশ্নপত্রের ধাঁচ, পঠনপাঠনের পদ্ধতিতে আদৌ কোনও পরিবর্তন নিয়ে আসা হবে? বর্তমানে উচ্চমাধ্যনমিকের প্রথম ও তৃতীয় সেমেস্টারের পরীক্ষা হয় ওএমআর শিট-এ। স্কুল স্তরেও বর্তমানে ছোট প্রশ্নের আধিক্যের ফলেই কি হারিয়ে যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের লেখার ক্ষমতা?
অনেক শিক্ষক অবশ্য সে কথা মানতে নারাজ। সৌগত বলেন, “এমসিকিউ প্রশ্নেও ভুল লেখে পরীক্ষার্থীরা। শুধু বড় প্রশ্নের উত্তর লিখতে ভুল হলে, ভাবতে পারতাম অনভ্যাসেই এই পরিণতি। কিন্তু তা তো নয়। আসলে পঠনপাঠনের পদ্ধতি ও মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।”
নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রবশেখর মণ্ডল জানান, ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীলতাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “শিক্ষাকে বহু বিকল্পমূলক প্রশ্ন বা এমসিকিউ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিশুকে মনকে কল্পনাপ্রবণ করে ভাষার মাধ্যমে তার বর্ণনা করার জন্য ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নের প্রয়োজন। তা না হলে লেখার পাশাপাশি ভাবনার ক্ষমতাও কমে যাবে।” এর সঙ্গে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও পরিকাঠানোর উন্নয়নের পক্ষেও মত দেন তিনি।