সিবিএসই-র ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পড়তে হবে তিনটি ভাষা। যেখানে দু’টি দেশজ ভাষা এবং একটি বিদেশি ভাষা রাখতে হবে। এই নিয়মেই ইংরেজিকে রাখা হয়েছে বিদেশি ভাষার তালিকায়। যে ভাষা দেশের অন্যতম প্রধান কথোপকথনের পরিসর হয়ে উঠেছে, সেই ভাষাকে স্কুল স্তর থেকে কি আদৌ বিদেশি ভাষার তালিকায় রাখা যায়? এমনই প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে শিক্ষামহলের একাংশের মধ্যে।
সম্প্রতি সিবিএসই বোর্ডের স্কুলগুলিতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তিনটি ভাষা শেখানোর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ বিতর্ক চলছে। বিতর্কের কারণ তিনটি ভাষা শেখা নিয়ে সিবিএসই-র নতুন নিয়মকানুন। সিবিএসই বলেছিল, তিনটি ভাষার মধ্যে অন্তত দু’টি ভাষা হতে হবে দেশজ। এর বাইরে একটি বিদেশি ভাষা শিখতে পারবে ছাত্রছাত্রীরা, যার মধ্যে ইংরেজি থাকবে। ইংরেজির বদলে ফরাসি বা অন্য বিদেশি ভাষাও শেখা যেতে পারে। আর তা নিয়েই প্রাথমিক বিতর্কের শুরু। কারণ, অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন— এত দিন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ভাষা হিসেবে যাঁরা ইংরেজি এবং ফরাসি শিখছিলেন, তাঁদের কি তবে যে কোনও একটি বাদ দিতে হবে?
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সুনন্দনকুমার সেন বলছেন, ‘‘ভারতীয় আর্য কিন্তু দেশের বাইরে থেকেই এসেছে। তার মানে কি ভারতীয় আর্য ভাষাগোষ্ঠীর প্রধান ভাষাগুলি (বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া, ওড়িয়া, মরাঠী, গুজরাতি, পঞ্জাবি, উর্দু, নেপালি, সিন্ধি, কোঙ্কণি, কাশ্মীরি, মৈথিলি, ভোজপুরি, রাজস্থানি) একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিদেশি? কিন্তু তা তো নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই ভাষা ব্যবহারের ফলে আমাদের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। এখন এই ভাষাগুলিকে কোনও ভাবে বিদেশি ভাষা বলা যায় না। ঠিক একই ভাবে ইংরেজি ভাষার সঙ্গেও মানুষ জড়িয়ে গিয়েছে নিত্যদিন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘এই ভাষাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে ইংরেজি অবশ্যই বিদেশি ভাষা। কিন্তু এর কার্যকারিতার দিক থেকে ইংরেজিকে কী ভাবে বিদেশি ভাষা বলা যায়, তা সত্যিই প্রশ্নের!’’
আরও পড়ুন:
ইংরেজি ভাষার জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও এই ভাষা বহু দশক ধরেই ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। এমনকি ভারতের নাগাল্যান্ড, মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশে ইংরেজি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। এই রাজ্যগুলি ছাড়াও দেশ জুড়ে নানা পরিসরে কমবেশি নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে এই ভাষা। ইংরেজিকে বিদেশি ভাষা হিসাবে তকমা দিতে কিছুটা নারাজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক শাশ্বতী হালদারও। তিনি জানিয়েছেন, ইংরেজি ভারতের মাটিতে জন্মানো ভাষা না হলেও, একে এখন আর পুরোপুরি বিদেশি ভাষা বলা যায় না। ভারতে শিক্ষা, প্রশাসন, আইন ও যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষাটি গভীর ভাবে মিশে গিয়েছে। এটি এক দিকে যেমন উৎপত্তির দিক থেকে বিদেশি, তেমনই কাজের জায়গায় ভারতের নিজস্ব স্থানীয় ভাষার মতোই সক্রিয়। তাই একে শুধু বিদেশি ভাষা না বলে ভারতের একটি অন্যতম দ্বিতীয় ভাষা বা সংযোগকারী ভাষা হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।
ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ২২টি ভাষা সরকারি ভাবে স্বীকৃত। যদিও ২০১১ সালের সরকারি আদমশুমারি অনুসারে ভারতে অন্তত ১০ হাজার মানুষের মৌখিক প্রধান ভাষার সংখ্যা প্রায় ১২১টি এবং ছোট-বড় উপভাষা মিলিয়ে মোট মাতৃভাষার সংখ্যা প্রায় ১,৯৫২টি। তবে, স্কুল স্তরে মাতৃভাষা ছাড়াও ইংরেজি (ইংরেজি মাধ্যমে তো বটেই) শেখার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়ে থাকে। যোধপুর পার্ক বয়েজ় স্কুলের প্রধান শিক্ষক অমিত সেন মজুমদারের মতে, ‘‘ইংরেজি, প্রায় আঞ্চলিক ভাষার মতোই। কোনও কিছু সকলের বোঝার জন্য যে ভাষা ব্যবহার করা হয়, তার মাধ্যম ইংরেজিই। তাই আলাদা ভাবে বিদেশি ভাষা হিসেবে অন্য কোনও বিদেশি ভাষা পড়লে হয়তো পড়ুয়াদের ভবিষ্যতে অনেকটা সাহায্য হতে পারে।’’
অন্যদিকে, যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্য ইংরেজি দেশি না বিদেশি ভাষা, সেই জায়গা ঠিক করার থেকেও জোর দিয়েছেন স্থানীয় ভাষার উপরেই। তাঁর কথায়, ‘‘ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি (এনইপি) ২০২০ বলছে সার্বিক ভাবে বৃদ্ধির কথা। সিবিএসই বলেছে দু’টি দেশীয় ভাষা এবং একটি বিদেশি ভাষা শিখতে পারবে পড়ুয়ারা। সেই জায়গা থেকে এনইপি ২০২০-র ধারণায় দু’টি দেশীয় ভাষা শেখার সুযোগও পড়ুয়ারা পাচ্ছে। তার ফলে নিজেদের সংস্কৃতির বিষয়েও ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ইংরেজিও শিখতে পারবে যদি পড়ুয়ারা চায়।’’