পুজোর ছুটির আগেই বিক্ষোভের আঁচে উত্তপ্ত হচ্ছিল সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)। শুক্রবার, ষষ্ঠীর দুপুরেই পড়ুয়ারা দাবি তুলেছিলেন উপাচার্যের পদত্যাগের। সন্ধ্যার মধ্যেই নয়া নির্দেশিকা জারি করলেন কর্তৃপক্ষ। বাড়ল পুজোর ছুটির মেয়াদ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হস্টেল খালি করে ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
নয়া বিজ্ঞপ্তি জারি করে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত পঠনপাঠন বন্ধ থাকবে এসআরএফটিআই-এ, পড়ুয়াদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ফিল্ম উইং এবং ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া (ইডিএম) উইংয়ের সমস্ত নিয়মিত কার্যকলাপ স্থগিত রাখা হচ্ছে। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর রেজিস্ট্রার দীপক কুমার এই নির্দেশ জারি করেছেন। ক্যাম্পাস খালি করার নির্দেশের পাশাপাশি জানানো হয়েছে, হস্টেল এবং মেস পরিষেবাও বন্ধ রাখা হবে।
প্রতিষ্ঠানের তরফে জানানো হয়েছে, আসন্ন উৎসবের মরসুম এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত। প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজকর্ম সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার স্বার্থে অবিলম্বে এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত, অথবা ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাজকর্মে ইচ্ছাকৃত বাধা সৃষ্টি করা কিংবা আইনসম্মত নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী শাস্তিমূলক বা আইনি পদক্ষেপ করা হতে পারে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, ফিল্ম উইং এবং ইডিএম উইংয়ের নিয়মিত পঠনপাঠন বন্ধ থাকবে। তবে নির্ধারিত সূচি মেনে চলবে আইটেক কর্মসূচি। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের তরফে সময়ে সময়ে জারি করা নির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে। ক্যাম্পাস খালি করার নির্দেশের পাশাপাশি হস্টেলের মেস পরিষেবাও ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত অথবা পরবর্তী নির্দেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে লাগাতার অবস্থান বিক্ষোভ চালাচ্ছেন এসআরএফটিআইয়ের পড়ুয়ারা। তার মধ্যে এই নির্দেশিকা নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। পড়ুয়াদের অনেকেই ভিন্রাজ্যের বাসিন্দা। ফলে এত কম সময়ের মধ্যে হস্টেল ছেড়ে কোথায় যাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার এক পড়ুয়া জানান, প্রাথমিক ভাবে দুর্গাপুজো উপলক্ষে শনিবার থেকে মঙ্গলবার অর্থাৎ ১৭ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা হয়েছিল। বুধবার থেকে ফের ক্যাম্পাস খোলার কথা। কিন্তু ছুটি পড়ার আগেই নয়া নির্দেশিকা জারি করেছেন কর্তৃপক্ষ। পড়ুয়াদের একাংশের দাবি, তাঁদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভ বানচাল করা এবং দাবি নসাৎ করতেই কর্তৃপক্ষের এই প্রচেষ্টা।
নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিন, বিভাগীয় প্রধান, হস্টেল ওয়ার্ডেন, নিরাপত্তা আধিকারিক-সহ সংশ্লিষ্ট কর্তাদের। নির্দেশ অমান্য করার ঘটনা নথিবদ্ধ করে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতেও বলা হয়েছে তাঁদের।
উল্লেখ্য, এসআরএফটিআইয়ে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে পড়ুয়াদের লাগাতার আন্দোলন চলছে। এই পরিস্থিতিতে নিয়মিত পঠনপাঠন বন্ধ রাখা এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পড়ুয়াদের ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ ঘিরে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে নির্দেশিকায় এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে সরাসরি পড়ুয়াদের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা হয়নি; উৎসবের মরসুম ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের এই নির্দেশের ফলে পড়ুয়াদের থাকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া এই বিজ্ঞপ্তির পর ছাত্র সংসদের তরফ থেকে জানানো হয়েছে পড়ুয়ারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন এবং তাঁদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিও ভিন্ন। এত অল্প সময়ের নোটিসে তাঁদের ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এর ফলে পড়ুয়ারা অচেনা শহরে খাবার ও থাকার ব্যবস্থা ছাড়াই সমস্যায় পড়তে পারেন।
তাঁরা জানিয়েছেন ইতিমধ্যেই ক্যাম্পাসের বাইরে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পড়ুয়াদের আশঙ্কা, যে কোনও মুহূর্তে তাঁদের জোর করে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করা হতে পারে। ইনস্টিটিউটের প্রশাসনিক আধিকারিক, শিক্ষক ও কর্মীরা ইতিমধ্যেই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গিয়েছেন। সমস্ত মেস পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। পড়ুয়াদের দাবি, তাঁদের জোর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার জন্যই এই পদক্ষেপ করা হচ্ছে। নিজেদের হস্টেলেই পড়ুয়াদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। খাবার ও থাকার বিকল্প ব্যবস্থা করার কোনও আগাম নোটিস বা সুযোগ না দিয়েই এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে। তাই এই নির্দেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি।
ছাত্র সংসদ এই নির্মম ও অমানবিক নির্দেশের তীব্র নিন্দা করছে এবং অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। পড়ুয়াদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সামান্যতম উদ্বেগ প্রকাশ না করে এমন নির্দেশ জারি করতে পারে না।
এই নির্দেশ প্রত্যাহারের দাবিতে জরুরি ভিত্তিতে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমস্ত সরকারি কর্তৃপক্ষ, প্রাক্তনী, শিক্ষক-কর্মী এবং দেশের অন্যান্য ফিল্ম ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের পড়ুয়াদের কাছে আবেদন জানিয়েছে ছাত্র সংসদ।
তাঁদের মত, এখন বিষয়টি আর শুধু শিক্ষাগত অব্যবস্থাপনা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এসআরএফটিআই কর্তৃপক্ষ সরাসরি পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উপর আঘাত করেছে। সেটা কোনও অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না।