শিক্ষাকে তাঁরা পণ্য হতে দেবেন না।
সোমবার বিকাশ ভবনে এসে এমনই জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান যে, ইতিমধ্যে যে সমস্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘নো অবজেশন সার্টিফিকেট’ বা ‘এনওসি’ পেয়েছে, সেখানে ‘ইন্সপেকশন’ বা পরিদর্শন হবে। যদি ফি কাঠামো সহ সব কিছু ঠিক থাকে, তাহলে আগামী দিনে আবার তাদের অনুমতি দেওয়া হবে। এ দিন ওই বৈঠকে দিল্লি থেকে আগত প্রায় ৮ জন আধিকারিক ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী দীপক বর্মন এবং রাজ্যের স্কুল ও উচ্চশিক্ষা দফতরের আধিকারিকেরা।
এ দিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘ইনস্পেকশন করার পরে তারা যদি যথাযথ ভাবে চলে এবং তাদের ফি যদি নিয়ন্ত্রিত থাকে সে ক্ষেত্রে তাদেরকে আগামী দিনে ছাড়পত্র বা অনুমোদন দেওয়া হবে। শিক্ষাকে আমরা পণ্য করতে দেব না। আর ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসির অন্তর্গত এই শিক্ষাকে আমরা উচ্চমানের শিক্ষায় নিয়ে যাব।’’
কী ভাবে বেসরকারি সংস্থাগুলি ছাড়পত্র পায়?
সিবিএসই অনুমোদিত কলকাতার একটি বেসরকারি স্কুলের অধ্যক্ষ জানান, এ রাজ্যে কোনও স্কুল চালু করতে গেলে প্রথমে রাজ্য সরকারের থেকে নো অবজেকশন এবং সার্টিফিকেট অফ রেকগনিশন প্রয়োজন হয়। তার পরে সিবিএসই-র কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে হয়। এটা চিরস্থায়ী। তার জন্য প্রতি বছর পুনর্নবীকরণ করতে হয় না। পাশাপাশি রাজ্য সরকার পরিদর্শন ও পরামর্শ দু’টোই দিতে পারে, তবে সার্টিফিকেট বাতিল করার আইন এখনও নেই।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে জানানো হয় যে, রাজ্য সরকার পরিদর্শন করতেই পারে। পরামর্শও দিতে পারে। কিন্তু ছাড়পত্র প্রতি বছর অন্তর পুনর্নবীকরণ করার কথা বলা নেই।তবে কলেজের ক্ষেত্রে এই নিয়ম আলাদা। একটি বেসরকারি কলেজের এক আধিকারিক জানান, সংশ্লিষ্ট কলেজ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত, সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর ছাড়পত্র পুননর্বীকরণ করে। পাশাপাশি, সেই কলেজে যদি প্রযুক্তির কোর্স থাকে তার অনুমোদন দেয় এআইসিটিই। এ ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই থাকে।
উচ্চশিক্ষা দফতর সূত্রের খবর, সরকার কখনওই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু শিক্ষা সঠিক পর্যায়ে হচ্ছে কি না সেটা সরকার অবশ্যই খতিয়ে দেখবে। পাশাপাশি, মুখ্যমন্ত্রী এ দিন জানিয়েছেন যে আলোচনা খুব ভাল হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়েও পড়ুয়াদের আধুনিক শিক্ষা কী ভাবে দেওয়া যায় তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, শিক্ষার সার্বিক উন্নতিতে সরকার কাজ শুরু করছে। ভারত সরকারের প্রকল্পগুলিতে ইতিমধ্যেই রাজ্য যুক্ত হয়েছে। বিগত সরকার নানা প্রকল্পে যুক্ত না হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও রাজ্যকে অর্থ সাহায্য করতে পারেনি। এর পরেই তাঁর সংযোজন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যের স্কুলগুলি অর্থসাহায্য পেতে শুরু করবে। তিনি জানান, বিগত সরকারের ভুল নীতির জন্য স্কুলগুলি তিন বছর ধরে কম্পোজ়িট গ্রান্ট পায়নি, সেগুলিও পাবে। এর জন্য প্রায় ৮১ হাজার স্কুলকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই অর্থবর্ষে সেই গ্রান্টও আমরা পাব।’’এ ছাড়া তিনি জানান, সব স্কুলে গ্যাসে মিড ডে মিল রান্না হবে। পর্যায়ক্রমে সোলার প্যানেলও বসবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শৌচালয় সহ আর্সেনিক মুক্ত পরিস্রুত পানীয় জল সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। মিড ডে মিলের জন্য পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকবে। এটা শুরু হচ্ছে বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম থেকে। যে বিদ্যালয়গুলিতে এখনও পাখা নেই, সেখানে পাখার বন্দোবস্ত করা হবে। বালিকা বিদ্যালয়গুলিতে এবং সহশিক্ষাক্রমের বা কো-এড স্কুল-কলেজগুলিতে ছাত্রীদের জন্য ‘স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন’ বসানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনীতিমুক্ত করে মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বিকাশ ভবন সূত্রের খবর, নির্বাচনের আগে থেকেই শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু ওবিসি সংরক্ষণের জটিলতায় তা পিছিয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন শিক্ষক পদপ্রার্থীরা। এ দিন মুখ্যমন্ত্রী জানান যে, ওবিসি সংক্রান্ত আইন ইতিমধ্যেই বিধানসভায় পাশ করা হয়েছে। বিগত সরকার ভুল করেছিল সেটা ঠিক করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে বিগত সরকার যে মামলা করেছিল, সেখান থেকেও বর্তমান সরকার সরে আসবে। ফলে নিয়োগের আর কোনও বাধা থাকবে না। তিনি বলেন, ‘‘আমরা সংকল্পপত্রে কথা দিয়েছিলাম, কোনও রাজনৈতিক লোক নিয়োগ প্রক্রিয়াতে থাকবে না।’’
এর পরেই তিনি জানান যে স্কুলের পরিচালন সমিতির উচ্চপদে অভিভাবকদের নিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষার যে নতুন আইন আছে, তা-ও পরিবর্তন করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে বলেছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিধানসভার আগামী অধিবেশনে বিল আনতে হবে। যাতে অভিভাবকদের মধ্যে থেকেই আগামী দিনে বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য চেয়ারম্যান অথবা ভাইস চেয়ারম্যান দায়িত্ব দেওয়া যায়।’’ পাশাপাশি তিনি জানান যে, আগামী অগস্ট থেকেই কলকাতায় মিড ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব নিচ্ছে ইস্কন। আগামী অগস্ট থেকে প্রাথমিকে মিড ডে মিলের জন্য মাথাপিছু ১০ টাকা ধার্য করা হয়েছে।
সূত্রের খবর এ দিন আলোচনা হয়েছে শিবপুর আইআইইএসটি-কে আইআইটি-র মর্যাদা দেওয়া যায় কিনা। এ দিন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার জানান, এই বিষয়ে এখনও রাজ্য সরকারের তরফে কোনও প্রস্তাব আসেনি। তবে প্রস্তাব এলেই কেন্দ্রীয় সরকার তা নিয়ম অনুযায়ী বিবেচনা করবে। তিনি বলেন, ‘‘ শিক্ষা দফতের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং রাজ্যের আগ্রহের কথা কেন্দ্র জেনেছে। পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে রাজ্যের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের উপরে।’’