‘শূদ্রেরা উচ্চবর্ণের সেবা করবে’ লেখা ‘গীতা অনুপ্রাণিত’ এক পোস্টার পড়েছিল আইআইটি মন্ডীর ক্যাম্পাসে। তা নিয়ে বিতর্ক বাড়তেই আইআইটি মন্ডীর অধিকর্তা লক্ষ্মীধর বেহেরা একটি লিখিত বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠান ওই ধরনের ভাবনাকে সমর্থন করে না। ঘটনাটির তদন্তের নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি। তার এক দিন পরেই শিক্ষা মন্ত্রকের তরফে একটি বিবৃতি দিয়ে জানানো হল, আইআইটি মন্ডীতে নতুন অধিকর্তা নিয়োগ করা হবে। এ ব্যাপারে আবেদনপত্র চেয়ে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে।
দু’টি ঘটনার মধ্যে আপাত ভাবে কোনও সংযোগ নেই। তবে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, আইআইটি মন্ডীর বর্তমান অধিকর্তা লক্ষ্মীধরের তরফে গীতা অনুপ্রাণিত পোস্টারের নিন্দা আর ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন অধিকর্তা চেয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের বিজ্ঞাপনের মধ্যে ২৪ ঘণ্টার তফাত কি কেবলই কাকতালীয়?
তবে এর পাল্টা যুক্তি দিয়ে অনেকেই বলছেন, লক্ষ্মীধর কানপুর আইআইটি থেকে আইআইটি মন্ডীর অধিকর্তা হিসাবে যোগদান করেছিলেন ২০২২ সালের জানুয়ারিতে। আইআইটি-র নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রচলিত নিয়ম বলছে, সাধারণত একটি আইআইটিতে এক জনই অধিকর্তা থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর নিয়োগ হয় চুক্তি ভিত্তিতে, মেয়াদ থাকে পাঁচ বছরের। সেই হিসাবে লক্ষ্মীধরের মেয়াদ শেষ হতে কয়েক মাস দেরি হলেও নতুন অধিকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া এখন থেকে শুরু করতেই পারে সরকার। এতে বিতর্কের কিছু নেই।
অবশ্য এমন নয় যে, আইআইটিতে এর আগে এই পাঁচ বছরের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়নি। বিশেষ করে, ভাল কাজ দেখালে সরকারি আনুকূল্যে ওই মেয়াদ বৃদ্ধিরও অবকাশ রয়েছে। বস্তুত এই মুহূর্তে দেশের দু’টি আইআইটিতে তেমন অধিকর্তা রয়েছেনও। আইআইটি তিরুপতিতে দ্বিতীয় বারের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধি হয়েছে কে এন সত্যনারায়ণার। আইআইটি জম্মুতেও মনোজ সিং গৌরের পদের মেয়াদ দ্বিতীয় বার বৃদ্ধি করা হয়। তা ছাড়া অতীতেও আইআইটি মাদ্রাজ, আইআইটি বম্বে, আইআইটি গাঁধীনগর এবং আইআইটি হায়দরাবাদে অধিকর্তারা পাঁচ বছরের অধিক মেয়াদে কাজ করেছেন। আইআইটি মন্ডীতেও আগে এমন হয়নি, তা নয়। আবার পাঁচ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
আসলে মন্ডীর বর্ণাশ্রম বিতর্ক, লক্ষ্মীধরের প্রতিবাদ আর ওই বিজ্ঞাপনের সময়কাল কাকতালীয় ভাবে মিলে যাওয়াতেই এমন প্রশ্ন উঠছে।
আইআইটি মন্ডীর সেই ‘গীতা অনুপ্রাণিত’ পোস্টার।
ঠিক কী হয়েছিল আইআইটি মন্ডীতে?
জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে হিমাচল প্রদেশের আইআইটি মন্ডীতে হঠাৎই নজর কাড়ে একটি পোস্টার। তাতে ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘শূদ্র শুড সার্ভ হায়ার ক্লাসেস’। অর্থাৎ শূদ্রেরা সমাজের উচ্চবর্গীয়দের সেবা করবে!
‘ভগবদ্গীতা— সময়োত্তীর্ণ বাণী’, এই শিরোনামে ওই পোস্টারে সমাজকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল— ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। এর মধ্যে ব্রাহ্মণের কাজ ঈশ্বরের বার্তা প্রচার করা। ক্ষত্রিয়ের কাজ সমাজ এবং আধ্যাত্মিকতাকে রক্ষা করা। বৈশ্যেরা অর্থনীতির দিকটি খেয়াল রাখবেন এবং অন্যদের আর্থিক ভাবে সাহায্য করবেন আর শূদ্রেরা উচ্চবর্গীয়দের সেবা করবেন। পোস্টারে ভগবদ্গীতার একটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, মানবসমাজের এই চারটি ভাগ করা হয়েছে সত্ত্ব, রজ এবং তম গুণ এবং কর্মের প্রকৃতির ভিত্তিতে।
আইআইটি-র মতো প্রতিষ্ঠানে জাতিবিভেদকে উস্কে দেওয়া অমন পোস্টার কী ভাবে এল, কর্তৃপক্ষই বা কেন কোনও পদক্ষেপ করেননি, এমন নানা প্রশ্নে বিতর্ক ক্রমশ বাড়ছিল। অবশেষে ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পরে বিষয়টি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন আইআইটি মন্ডীর অধিকর্তা লক্ষ্মীধর।
একটি ই-মেলে লক্ষ্মীধর লেখেন, ‘‘ক্যাম্পাসের মধ্যে সম্প্রতি যে পোস্টার দেখা গিয়েছে, তার তীব্র নিন্দা করছি।’’ তিনি জানান, ওই পোস্টারের বক্তব্যকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনও ভাবেই সমর্থন করে না। পাশাপাশি এ-ও লেখেন যে, ‘‘আমি এ ব্যাপারে একটি অনুসন্ধান কমিটি তৈরি করেছি। তারা বিষয়টি দেখবে। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, তা-ও নিশ্চিত করা হবে। যাঁরা এই ঘটনায় আহত হয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার সহানুভূতি রয়েছে।’’
রবিবারের রাতের ওই ই-মেলের এক দিন পরেই শিক্ষামন্ত্রকের তরফে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে আইআইটি মন্ডীর নতুন অধিকর্তা নিয়োগের।