বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বদলি সংক্রান্ত বিলটি আইনে পরিণত হলে সমস্যায় পড়বে গবেষণা। এমনকি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানচিত্রে আরও পিছিয়ে পড়বে এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। এমনই দাবি যাদবপুরের গবেষক পড়়ুয়াদের। শিক্ষকেরা এ নিয়ে আগেই সরব হয়েছিলেন। এ বার গবেষকদের তরফ থেকেও এই বিলের বিরোধিতা করা হচ্ছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও কলা সব বিভাগেই গবেষণায় খারাপ প্রভাব প়ড়ার আশঙ্কা।
জৈবপ্রযুক্তির এক গবেষকের দাবি, মাঝ পথে গাইড পরিবর্তন হতে পারে, এমন সম্ভাবনা তৈরি হলে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণা করতে আসাই ঝুঁকির হয়ে যাবে। মেধাবী পড়ুয়ারা আরও বেশি রাজ্যের বা দেশের বাইরে চলে যেতে চাইবেন। ওই গবেষক বলেন, “আমরা যে অধ্যাপকের সঙ্গে কাজ করতে চাই, যিনি প্রজেক্ট নিয়ে আসছেন, যিনি ওই প্রজেক্টের টাকা আনছেন, তিনি সরে গেলে সেই গবেষণা হবে কী ভাবে? তিনিই তো মেশিন, যন্ত্রাংশ এনেছেন। তিনি অন্যত্র চলে গেলে ওই ফান্ডিং আর যন্ত্রাংশের কী হবে! বদলির আইন চালু হলে গোটা গবেষণা পরিসরটিই বিপর্যস্ত হবে।’’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে গবেষণা করছেন পরিপূর্ণা মজুমদার। তিনি জানান, ২০০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের যে বিধি রয়েছে এই বিল তো তারই বিপরীত। তাঁর দাবি, ওই বিধিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, যে শিক্ষক গবেষণায় সুপারভাইজ়ার হবেন তাঁকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেই কর্মরত থাকতে হবে। কিন্তু নতুন বদলি নীতি কার্যকর হলে সেই নিয়মই ভাঙা হবে। পাশাপাশি ফেলোশিপ পাওয়ার জন্য যখন প্রকল্পের রেজিস্ট্রেশন হয় তখন গাইডের স্বাক্ষর থাকে। পরবর্তী ফেলোশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নিয়ম মানা হলে গাইডের পরিবর্তন হলে ফেলোশিপ বন্ধ হলে গবেষণা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে এই মুহূর্তে চালু কোনও গবেষণার সুপারভাইজ়ার বদলি হলে ক্ষতি হবে গবেষণার।
একই ভাবে ‘স্পিচ থেরাপি’ নিয়ে গবেষণা করা এক পড়ুয়ার দাবি, এ ধরনের গবেষণা খুবই জটিল। তাই এ ধরনের বিষয়ে যিনি গাইড, তাঁর মতো দক্ষতা অন্য অধ্যাপকদের না-ও থাকতে পারে। ফলে গাইড পরিবর্তন করার অর্থ পুরো গবেষণার ক্ষতি করে দেওয়া।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে পাশ হওয়া ‘দ্য ইউনিভার্সিটিস অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬’। ইতিমধ্যে সেই বিল নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বার বার বলেছেন, শিক্ষার স্বার্থে রাজ্যের প্রাচীন ও বৃহৎ আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-অধ্যাপক, এবং কর্মী-আধিকারিকদের বদলি করা হবে অপেক্ষাকৃত নতুন ও ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। বিরোধী বিধায়কেরা বার বার প্রশ্ন তুলেছেন, এত তাড়াহুড়ো করে এ বিল পাশ করানোর কী প্রয়োজন ছিল? এই বিল কাজে লাগিয়ে সরকার কোনও রকম প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করবে না তো?
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বার বারই বলেছেন, এই বিলের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা নেই। উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারের নামে যা খুশি তাই করা যায় না। তেমন যদি হয়, সে ক্ষেত্রেই সরকারের অস্ত্র হবে এই বিল।
এর বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ শুরু করেন শিক্ষকেরা। কলকাতা প্রেস ক্লাবে প্রায় ১৬টি শিক্ষক সংগঠন একযোগে এই সম্মেলন করেন। সেখানেই তাঁরা জানিয়েছিলেন প্রতিবাদের প্রথম ধাপ হিসেবে আচার্যের কাছে এই বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানাবেন। না হলে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের পথেও যাবেন বলে জানিয়েছিলেন শিক্ষকেরা।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর আচার্যের কাছে পাঠানো আবেদনপত্রে চাকরির শর্ত লঙ্ঘন, কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়াই বদলি, গবেষণাকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার বেসরকারিকরণের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনপত্রের শেষে আচার্যের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করেছেন তাঁরা।
এ বার গবেষকরাও সাফ জানিয়ে দিলেন যে এই বিল আইনে পরিণত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গবেযক পড়ুয়ারাই।