নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য নতুন সমাজবিজ্ঞানের বই প্রকাশ করেছে এনসিইআরটি। আর তাতে ৭০০ বছরের মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘‘প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করার’’ সময় হিসাবে। বইয়ে ১০০০-১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কালের ভারতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘‘ওই সময়ে ভারতীয় সমাজ শুধু বহিরাগত অনুপ্রবেশকারীদের আক্রমণ এবং তাদের থেকে আসা সম্ভাব্য বিপদ থেকেই নিজেকে রক্ষা করেনি, সেই সঙ্গে নিজের প্রাচীন ঐতিহ্যকেও নষ্ট হয়ে যেতে দেয়নি। নিজেদের ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষা করেছে। ’’
সংঘাত নাকি সহযোগিতা?
নতুন বইটির নাম ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড পার্ট টু’। এ বইয়ের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল জুন মাসে। সেই বইটিতে ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভূগোল, অর্থনীতি-সহ নানা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। নব্যপ্রকাশিত দ্বিতীয় খণ্ডে ‘‘এ দেশের প্রতিরোধ, সংঘাতের পাশাপাশি একসঙ্গে মিলেমিশে থাকার কথা’’ বলা হয়েছে ঠিকই, তবে জোর দেওয়া হয়েছে মূলত প্রতিরোধের ঘটনাতেই। মিলেমিশে থাকা সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার ইতিহাস বা মিশ্র সংস্কৃতির বিকাশ, যা গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের ইতিহাসচর্চার মূল বিষয় ছিল, তা এখানে ততটা গুরুত্ব পায়নি।
উপমহাদেশে একের পর এক আক্রমণের কথা লিখতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানের ওই বইয়ের ইতিহাসের অংশে বলা হয়েছে, কী ভাবে রাজপুত, আহোম রাজ্য, বিজয়নগর সাম্রাজ্য, মরাঠা, শিখ, জাঠ-সহ বিভিন্ন ভারতীয় শাসক নানা সময়ে তুর্কি, মোগল ও ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে কড়া প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। লেখা হয়েছে, ‘‘উপমহাদেশে বার বার আক্রমণ আর যুদ্ধ হয়েছে, সঙ্গে এসেছে ধর্মীয় বৈষম্য ও সামাজিক দুর্দশা। আক্রমণকারীরা বার বার দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে পড়ে ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করলেও আঞ্চলিক শক্তিগুলি প্রায়ই রুখে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিরোধ যেমন সামরিক দিক থেকে হয়েছে, তেমনই সংস্কৃতিকেও ঢাল বানানো হয়েছে প্রতিরোধের।’’
ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং দেবীপুজার আখ্যান
যুদ্ধের সময় ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভূমিকাও দেখানো হয়েছে পাঠ্যের ইতিহাস অংশে। প্রতিরোধ এবং ঘুরে দাঁড়ানো বিষয়ক যে অধ্যায়ের কথা বলা হচ্ছে, তার একটি সাব সেকশন বা উপ-অধ্যায় হিসাবে রয়েছে দেশের ভক্তি আন্দোলনের ঐতিহ্যের কথাও। ওই উপ-অধ্যায়ের নাম ‘ভক্তি ঐতিহ্য: ঘুরে দাঁড়ানোর চেতনার প্রকাশ’।সেই অধ্যায়ের শেষে ‘জানতে ভুলো না’ শীর্ষক স্তম্ভে লেখা হয়েছে, ‘‘এ দেশে দেবীশক্তির পুজো করার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। সপ্তম শতক থেকে বহু রাজা এবং রাজকুমার যুদ্ধের সময় কালী, দুর্গা, ভবানী ও শক্তির অন্যান্য রূপের আরাধনা করতেন যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য।’’
ওই একই স্তম্ভে এ-ও বলা হয়েছে যে, ‘‘বস্তারের শাসক অন্নমরাজা দেবী মাণিক্যের (দন্তেশ্বরী) কাছ থেকে তরবারি পেয়েছিলেন বলে বিশ্বাস রয়েছে। বিজয়নগরের কুমার কম্পনও মাদুরাইয়ের সুলতানের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য দেবীর দেওয়া তরবারি ব্যবহার করেছিলেন বলে মনে করা হয়। ঠিক যেমন শিবাজীও দেবী তুলজা ভবানীর কাছ থেকে তলোয়ার পেয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।’’
এনসিইআরটি-র প্রধানের বক্তব্য
নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্য ওই বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন এনসিইআরটি-র প্রধান দিনেশ সকলানী। বইয়ের বক্তব্য সম্পর্কে তাঁর মতামত সেখানেই জানিয়েছেন তিনি। এনসিইআরটি প্রধানের কথায়, ‘‘শেখার এই স্তরে সমাজবিজ্ঞান পাঠের উদ্দেশ্য হল ছাত্রছাত্রীদের বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ক্ষমতা গড়ে তোলা। আর কৌতূহল মেটানোর জন্য কোনও বিষয়ে প্রশ্ন করে যাচাই করে নেওয়ার অভ্যাসকে আরও বেশি করে উৎসাহ দেওয়া। এ দেশে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে যে বোঝাপড়া, সেই সম্পর্কে বোধ তৈরি করাও উদ্দেশ্য। এ ছাড়া, নাগরিক ও সামাজিক জীবনে শিক্ষার্থীরা যাতে আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ নিয়ে যোগ দিতে পারে, সেই যোগ্যতা তৈরি করাও লক্ষ্য হওয়া দরকার।’’ দীনেশ লিখেছেন, ‘‘সেই সমস্ত ভাবনাকে মাথায় রেখেই নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞানের ওই বই পরিকল্পনা ও তৈরি করা হয়েছে।’’
আগে যা ছিল এখন যা হল
নতুন বইগুলি যে চারটি পুরনো বইয়ের জায়গা নিয়েছে, তার মধ্যে একটি হল ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ড’, যাতে ছিল ফরাসি বিপ্লব, ইউরোপের সমাজতন্ত্র, রুশ বিপ্লব, নাৎসিবাদের উত্থানের আলোচনা। দ্বিতীয় বইটির নাম ‘ডেমোক্র্যাটিক পলিটিক্স-ওয়ান’, যা ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং সমাজবিদ্যা বিষয়ে। এ ছাড়া ‘কনটেম্পোরারি ইন্ডিয়া-১’ বইটির মুখ্য আলোচ্য ছিল ভুগোল। চতুর্থ বইটি ছিল নবম শ্রেণির অর্থনীতি বিষয়ক পাঠ্য বই।
এর মধ্যে আধুনিক বিশ্ব ইতিহাস থাকলেও মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস ছিল না। মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস মূলত পড়ানো হত সপ্তম শ্রেণিতে। তবে ২০২০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী সেই কাঠামো বদলেছে। নবম শ্রেণির পাঠ্যক্রমে ইউরোপ কেন্দ্রিক ইতিহাস সরিয়ে মধ্যযুগীয় ইতিহাস রাখা হয়েছে। ‘রেজ়িস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজ়িলিয়েন্স (১০০০-১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ)’ নামের একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায় জুড়েছে সমাজবিজ্ঞানের নবম শ্রেণির বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে। সেখানেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাস সংক্রান্ত নানা তথ্য।
মোগলদের সম্পর্কে যা যা লেখা হয়েছে বইয়ে
দিল্লির সুলতানি আমলের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে কেবল এক পাতা, তাতে স্থানীয় রাজাদের প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। মোগল আমলের কথা অবশ্য কিছুটা বিস্তারিত ভাবেই বলা হয়েছে, তবে সেখানেও মোগলদের সঙ্গে সহযোগিতার চেয়ে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে বর্ণনায়। যেমন— রাজস্থানের অম্বরের সূর্যবংশী রাজপুত কচ্ছবাহাদের সঙ্গে মোগলদের ‘সহযোগিতার সম্পর্ক’ ছিল, সে কথা খুব সংক্ষেপে উল্লেখ করলেও বইয়ে লেখা হয়েছে, আসলে মোগলদেরই ‘জোরালো তাগিদ’ ছিল রাজপুতদের সঙ্গে হাত মেলানোর। অন্য দিকে, মোগল বাদশাহ আকবরের বিরুদ্ধে মেওয়ারের রাজা মহারাণা প্রতাপের যুদ্ধের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে লেখা হয়েছে গোটা একটা অধ্যায়। একটি অধ্যায়ে লেখা হয়েছে অসমের আহোম রাজ্যের কথাও, যে রাজ্য প্রায় ছয় শতক ধরে নিজেদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ধরে রেখেছিল এবং মোগলদের হাত থেকে সফল ভাবে রক্ষা করেছিল নিজেদের এলাকা। সরাইঘাটের যুদ্ধের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘‘আহোম সেনাপতি লাচিত বরফুকন মোগল নৌবহরকে হারিয়ে দিয়েছিলেন’’। এ প্রসঙ্গে শিখদের প্রতি মোগল শাসকের ‘‘কট্টর ধর্মীয় ও বৈষম্যমূলক আচরণ’’-এর কথা এনে বলা হয়েছে, শিখ গুরুদের শহিদ হওয়ার কথা এবং পরে ঔরঙ্গজেবের ধর্মীর নীতির বিরুদ্ধে জাঠদের ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনিও।
মন্দির-মসজিদ প্রসঙ্গ
বইয়ে একাধিক মন্দির ভাঙার এবং সেই জায়গায় মসজিদ তৈরির উল্লেখ করা হয়েছে। এক জায়গায় যেমন জানানো হয়েছে, ‘‘কাশী বিশ্বনাথ মন্দির টোডরমল ও মানসিংহ আবার তৈরি করিয়েছিলেন, পরে ঔরঙ্গজেব তা ভেঙে দেন, তার পর অহল্যাবাই হোলকার সেটি নতুন করে গড়েন।’’ মন্দির তৈরিতে বাধা এলে কিংবা মন্দির ভেঙে ফেলা হলে ভক্তেরা ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে বস্তুনিরপেক্ষ উপাসনার পথ পেয়েছিলেন— সে কথারও উল্লেখ রয়েছে বইয়ে। এ প্রসঙ্গে এসেছে, চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রসঙ্গও। বলা হয়েছে বঙ্গে ‘‘কাজির চাপানো নিষেধাজ্ঞার’’ বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সঙ্কীর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চৈতন্যদেব। সুফিবাদকে ইসলামের তুলনায় উদার বলে উল্লেখ করা হয়েছে বইয়ে। তবে ইসলামের প্রচারে তার ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে।