কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির কণ্ঠরোধের সরকারি চেষ্টা নতুন ঘটনা নয়। তবে কোনও কোনও দেশে সেই সরকারি চোখরাঙানি নিয়মিত এবং মাত্রাছাড়া। সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে দেখা গিয়েছে তেমন দেশের তালিকায় বেশ ‘খারাপ’ অবস্থানে রয়েছে ভারতের নাম। তাদের জায়গা অনেকটাই নীচে।
উচ্চশিক্ষার উপরে আসা ক্ষমতাসীন সরকারের আক্রমণের ঘটনায় নজর রাখে ‘স্কলার্স অ্যাট রিস্ক’ নামের এক সংগঠন। তাদেরই একটি রিপোর্টে সম্প্রতি উঠে এসেছে ওই তথ্য। ‘ফ্রি টু থিঙ্ক ২০২৬’ শীর্ষক সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরে উচ্চশিক্ষার উপর এমন হামলা হয়েছে ৩৮২ বার।
মোট ৫৯টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি হয়েছে রিপোর্ট। রিপোর্টের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে স্কোর শিট, যার নাম ‘অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম ইনডেক্স’। যে দেশে শিক্ষার স্বাধীনতা যত বেশি সংকোচন করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের ঘটনা ঘটেছে, ততই কমেছে সে দেশের প্রাপ্ত নম্বর। দেখা গিয়েছে, গত এক দশকে ১৭৯টি দেশের মধ্যে ৫০টি দেশেই শিক্ষার স্বাধীনতার অবনতি হয়েছে। আর ওই তালিকায় রয়েছে আমেরিকার মতো উন্নত দেশও।
২০২৪ সালেই অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম ইনডেক্সে আমেরিকার নম্বর ছিল ২.৪। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৭-এ। অন্য দিকে, ভারতের নম্বর ২০২২ সালে ছিল ০.৩৮ যা ২০২৬ সালের পর এসে ঠেকেছে ০.১৪-এ। অর্থাৎ চার বছরে এ দেশে শিক্ষার স্বাধীনতার অবনতি হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৬ সালের অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম ইনডেক্স বলছে, এই মুহূর্তে শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বাধীন ভাবে চলতে দেওয়ার ব্যাপারে আফগানিস্তানও এগিয়ে রয়েছে ভারতের থেকে। তালিবান-শাসিত সেই দেশে শিক্ষার স্বাধীনতার নির্ণায়ক নম্বর ০.১৭।
নানা কারণ দেখিয়ে ওই রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ভারতে শিক্ষার স্বাধীনতা ‘সিভিয়ারলি রেস্ট্রিকটেড’ অর্থাৎ ‘কঠোর ভাবে সঙ্কুচিত’। রিপোর্টে এ-ও বলা হয়েছে যে, ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চশিক্ষার উপর প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা আগের থেকে অনেকটা বেড়েছে।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রশাসনিক পরিচালনায় সরকারি প্রভাব খাটানো উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত শীর্ষপদে (যেমন উপাচার্য, অধিকর্তা) নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি প্রভাব খাটানো, উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষককে বরখাস্ত করা, সরকারি অঙ্গুলিহেলনেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান বাতিল করা, ছাত্রছাত্রীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে বহু বার। এমনকি, বিভিন্ন বিক্ষোভ বা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হওয়া সমাবেশে ছাত্র এবং পুলিশ—উভয় পক্ষই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে।
রিপোর্টে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের (ইউজিসি) কথা। তাতে বলা হয়েছে, ‘‘ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার উচ্চশিক্ষার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ইউজিসিকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।’’ আর এই সমস্ত কারণেই ভারতের শিক্ষার স্বাধীনতা খাতে প্রাপ্ত নম্বর কমেছে। যে সব দেশে ‘শিক্ষার স্বাধীনতা কঠোর ভাবে সঙ্কুচিত’, সেই তালিকায় নাম উঠেছে ভারতের।
ওই একই বিভাগে ভারত ছাড়া রয়েছে হংকং, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ব্যাংক, আফগানিস্তান, তুরস্ক এবং ইউক্রেনের নামও। অন্যদিকে, চিন, কোরিয়া, ইরান, মায়ানমার, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা, জিম্বাবোয়ে এবং গাজার মতো অঞ্চলগুলিকে রাখা হয়েছে সবচেয়ে নিম্ন স্তরে। যেখানে শিক্ষার স্বাধীনতা কমপ্লিটলি রেস্ট্রিকটেড বা ‘সম্পূর্ণভাবে সংকুচিত’।