প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষার হাল ফেরাতে এক ক্লাস এক শিক্ষক নীতি প্রণয়নের কথা ভাবছে রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদে এমনই জানিয়েছিলেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন। তবে এই নিয়ম চালু হওয়ার আগে স্কুলশিক্ষার বেশ কিছু দিক ও পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকেরা। তাঁদের দাবি, পরিকাঠামো উন্নয়নে জোর না দিলে হাল ফেরানো সম্ভব নয়। নয়া নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোন কোন দিক পর্যালোচনা করলে ভাল হয়, তা নিয়ে মতামত দিয়েছে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন।
তালিকায় রাখা যাবে না প্রধানশিক্ষককে
স্কুল শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন প্রতিটি ক্লাসের জন্য একজন করে শিক্ষক থাকবেন। তিনিই সব বিষয় পড়াবেন। বছরের শেষে পড়ুয়ারা কটা পড়তে লিখতে পারছে বা সার্বিক উন্নতি কতটা হচ্ছে সেই দায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের। এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে শিক্ষকদের একাংশের দাবি, শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের দাবি অনেক দিন ধরেই তাঁরা করে আসছেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে স্কুলের প্রধানশিক্ষককে ক্লাসের শিক্ষক হিসেবে গণ্য করলে চলবে না। কারণ প্রধানশিক্ষকদের নানা প্রশাসনিক কাজ রয়েছে। তাই নিয়ম করে কোনও ক্লাসের দায়িত্ব তাঁর পক্ষে সঠিক ভাবে পলন করা অসম্ভব। তা ছাড়া কোনও শিক্ষক শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত কারণে ছুটি নিলে সেই দিন কি ক্লাস বন্ধ থাকবে? শিক্ষকেরা জানান সেই দিন গুলিতে বিশেষ ভাবে প্রধানশিক্ষক ক্লাস নেবেন। তাই এই নীতি কার্যকর করতে হলে প্রধানশিক্ষকদের এই তালিকা থেকে বাদ রাখতে হবে।
একটি ক্লাসে বেশি পড়ুয়া হলে গোলমাল হবে অনুপাতে
নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রবশেখর মণ্ডলের দাবি, যেখানে কোনও ক্লাসে ২০ জনের বেশি পড়ুয়া রয়েছে সেখানে একজন শিক্ষক থাকলে অনুপাতে গোলমাল হবে। সেই বিষয়টিও ভাবনার মধ্যে রাখা প্রয়োজন।”
ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শিক্ষকেরা। সেখানে সরকারি নীতি কার্যকর করায় সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা। বৃহস্পতিবার স্কুলশিক্ষামন্ত্রী সারপ্লাস বদলির কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, আপাতত তিনজন করে শিক্ষককে রাখা হবে একটি স্কুলে। বাকিদের ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতে বদলি করা হবে। দ্রুত এই নিয়ম চালুও হবে বলেই দাবি স্কুলশিক্ষামন্ত্রীর।
এক স্কুলে তিন শিক্ষক হলে চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণি পড়াবেন কে?
এছাড়াও প্রশ্ন উঠছে পঞ্চম শ্রেণি নিয়ে। বহু স্কুলে প্রাথমিক স্তরে পঞ্চম শ্রেণি যুক্ত থাকে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দাবি, কোনও স্কুলে যদি মোট ৬০ জন পড়ুয়া থাকে এবং সেখানে প্রধানশিক্ষককে ছাড়া তিন জন শিক্ষক থাকেন, তা হলেও অনুপাত ব্যাহত হবে না হলেও স্বাভাবিক পঠনপাঠন ব্যাহত হবে। কারণ ক্লাসের হিসাবে শিক্ষকেরা সংখ্যা কম হবে।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “পড়ানো হয় প্রথম থেকে চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। সরকার বলছে সব স্কুলে রাখা হবে তিন জন শিক্ষক। তা হলে কী ভাবে ক্লাস পিছু একজন শিক্ষকের নীতি কার্যকর হবে?”
যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষককে ক্লাস দেওয়া
এরই পাশাপাশি শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চের তরফে দাবি, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ না করে এই নীতি চালু করলে তা ফলপ্রসূ হবে না। এ ছাড়া, কোন শিক্ষক কোন ক্লাসে পড়াবেন, তা যেন যোগ্যতার নিরিখেই স্থির করা হয়। স্কুলের প্রধানশিক্ষক তা নির্ণয় করলেও তার যেন নির্দিষ্ট রূপরেখা থাকে।
শিক্ষকদের দাবি, বহু স্নাতক বা স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ প্রার্থীও প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকতা করেন। সে ক্ষেত্রে দ্বাদশ উত্তীর্ণ কোনও শিক্ষককে পঞ্চম শ্রেণি পড়াতে দিয়ে স্নাতক শিক্ষককে যেন প্রথম শ্রেণি পড়াতে দেওয়া না হয়।
বিজেপি শিক্ষক সেলের সহ-আহ্বায়ক ও প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের অ্যাডহক কমিটির সদস্য পিন্টু পাড়ুইয়ের দাবি, “তলানিতে চলে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করতে সকলকে উদ্যোগী হতে হবে। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী সেটাই বলেছেন। শিক্ষকেরা আরও বেশি দায়িত্ব নিলে পড়ুয়ারাই উপকৃত হবে। মন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবোচিত। আমরা সম্পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি।” পাশাপাশি তিনি জানান, বর্তমানে বহু স্কুলে ২ জন করে শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের তরফে দফতরে আবেদন করার পরে আপাতত একটি স্কুলে কমপক্ষে অন্তত ৩ জন করে শিক্ষক রাখার কথা বলা হয়েছে। আগামী দিনে শিক্ষক নিয়োগ হলে বাকি সমস্যাও মিটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।