ইতিহাসে বার বার এই বাংলা রক্ষা করেছে গণতন্ত্রকে, প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে। তাই সময় এসেছে, এ বারে শুধু নিজের মাটিকে নয়, গোটা দেশকে রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে এই বাংলাকেই। পাশাপাশি, তিনি সাফ বার্তা দিলেন, দিল্লিতে রক্ত ঝরলে যেমন কলকাতা যন্ত্রণা পায়, তেমন কলকাতায় রক্ত ঝরলে দিল্লিও উঠে দাঁড়াবে। সোমবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের আয়োজনে ‘জেন জ়ি আন্দোলন: প্রজন্ম ও প্রতিরোধের ঐক্য’ শীর্ষক এই কনভেনশনে এসে এ ভাবেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এবং ছাত্র-যুবকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেন ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-এর সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা। এই কনভেনশনে উপস্থিত ছিলেন এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)-এর পড়ুয়া প্রতিনিধি-সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রনেতারা।
সম্প্রতি ভারতের মুখ্যনির্বাচনী অফিসার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন নেহা। তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে যে ভাবে পুলিশ আটক করেছে, তার ভিডিও সামাজমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ দিন তিনি যাদবপুরে এসে বলেন, ‘‘দিল্লিতে রক্ত ঝরলে কলকাতা যন্ত্রণা পায়। আর কলকাতায় রক্ত ঝরলে দিল্লি অবশ্যই উঠে দাঁড়াবে। এটাই আমাদের পরস্পরের প্রতি প্রতিশ্রুতি। আমরা বার বার এই সংহতির প্রতিশ্রুতি দিতে থাকব। আর এই সংহতি এবং এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই একটি নতুন ভারত, একটি নতুন বাংলা অবশ্যই গড়ে উঠবে।’’ যাদবপুর, এসআরএফটিআই-সহ নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহিরাগতদের হামলার বিরুদ্ধে সরব হন। বিজেপি ক্ষমতায় এসেই গণতন্ত্রকে বিপন্ন করে তুলেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আর এই গোটা বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে এই রাজ্যকেই উদ্ধারের দায়িত্ব নেওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। নেহা বলেন, ‘‘বাংলা বার বার নিজেকে এবং গোটা দেশকে রক্ষা করেছে। বাংলা প্রগতিশীল চিন্তাকে রক্ষা করেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বাংলা গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছে। আজ আবার বাংলার সামনে দায়িত্ব— শুধু নিজেকে নয়, প্রগতিশীল চিন্তাকে নয়, নিজের মাটিকেই নয়, গোটা দেশ এবং যে গণতন্ত্র নিয়ে আমরা গর্ব করি, তাকেও রক্ষা করা।’’ সব বামপন্থী ছাত্র-যুবকে একসঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি। তবে, এবিভিপি-র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নিখিল দাস দাবি করেন যে, এ দিনের বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। সেখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বামপন্থার প্রতি নতুন প্রজন্ম এবং সাধারণ মানুষের কোনও আস্থা নেই। পাল্টা আয়োজকদের তরফে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, আস্থা রয়েছে কি না, তা পথেই প্রমাণ হবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০, এনটিএ, এসআইআর, আইএসআই বিল বাতিল-সহ ‘স্কুল বাঁচাও শিক্ষা বাঁচাও’-এর দাবিতে এ দিনের কনভেনশনে যোগ দেন সিজেপির প্রতিনিধিও। সিজেপির তরফে দেদীপ্য গঙ্গোপাধ্যায় এ দিন হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, যন্তর মন্তরে আগামী ১০ তারিখ থেকে তাঁরাও আন্দোলন শুরু করবেন। একই ভাবে এসআরএফটিআই-এর ছাত্র প্রতিনিধিরা বলেন, ‘‘আপনারা আমাদের শরীরে আক্রমণ করতে পারেন, কিন্তু আমাদের কল্পনা ও আমাদের শিল্পের উপর আক্রমণ করতে পারবেন না।’’ অনু্ষ্ঠানে উপস্থিত এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য এ দিন বলেন, ‘‘বর্তমান সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের ফলে আমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগার এবং মহাত্মা গাঁধীরা হাতিয়ার হয়ে উঠেছেন। ফ্যাসিস্টদের বিরোধিতায় এই মহান মানুষদের আদর্শই আমাদের কাছে হাতিয়ার।’’ এ দিন দুপুর ৩টে নাগাদ প্রথমে কেপি বসু মেমোরিয়াল প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠান শুরু হয়। কিন্তু অতিরিক্ত দর্শক উপস্থিত হওয়ায় মাঝপথে গাঁধী ভবনের বাইরে বিকেলে এই অনুষ্ঠান হয়।
তবে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ে প্রথম থেকেই আপত্তি জানিয়েছিল এবিভিপি। কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। নিখিল দাস বলেন, ‘‘কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বহিরগাতেরা ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান করল, এটা আইন বিরুদ্ধ। আমার কর্তৃপক্ষকে তা জানিয়েছি।’’ বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার দেবজিৎ দত্ত আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রতিনিধিকে বলেন, ‘‘আমার অফিস থেকে কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। আগামী কাল বিষয়টি খতিয়ে দেখব, প্রয়োজনে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’’
যাদবপুরের পড়ুয়া তথা এসএফআই-এর নেত্রী এষণা সেন রেজিস্ট্রারের পদক্ষেপের বিষয়ে বলেন, ‘‘আমাদের অনুষ্ঠানে কোনও সমস্যা হয়নি। যখন বহিরাগত ঢুকিয়ে এবিভিপি গোলমাল করে তখন কর্তৃপক্ষ কী করছিলেন? আর আমাদের অনুষ্ঠান নিয়ে রেজিস্ট্রার কী পদক্ষেপ নেন, সেটাও আমরা দেখতে চাই।’’ আর এবিভিপির বক্তব্যের পাল্টা তিনি জানান, যন্তর মন্তরে এবং এই অনুষ্ঠানে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, বামপন্থার প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে কি না।