যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা দেওয়াললিখন ছাড়তে নারাজ। রবিবার কর্তৃপক্ষ দেওয়ালের একাংশে চুনকাম করে দেওয়ার পর সোমবার সকালেই সেখানে ফুটে ওঠে নতুন লিখন। তার দায়িত্ব অবশ্য নেয়নি এসএফআই। বরং সোমবার তারা পালন করেছে ‘দেওয়াল দখল’ কর্মসূচি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে বাম মনোভাবাপন্ন পড়ুয়ারা লিখে দিয়েছেন তাঁদের মতাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নানা পঙ্ক্তি।
সোমবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএফআই ‘টেক ব্যাক ইয়োর ওয়ালস’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট-এর কাছে দেওয়াললিখন এবং চিত্রাঙ্কনের কাজ শুরু হয়। তার পর ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে নানা জায়গায় নতুন করে দেওয়াললিখন শুরু করেন এসএফআই-এর পড়ুয়া সদস্যরা। কোথাও লেখা হয় ‘ভাবনাকে গুলি করে ধ্বংস করা যায় না’, কোথাও লেখা হয় ‘প্রতিরোধ দীর্ঘজীবী হোক’।
জানা গিয়েছে, এসএফআই ছাত্র সদস্যরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিও এঁকেছেন। এসএফআই সদস্য অঞ্জিল জানান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে লেখা হিটলার মুসোলিনির গ্রাফিতি মুছে ফেলা মানে ফ্যাসিবাদের পক্ষ সমর্থন করা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিশানা করে ছাত্রনেতা বলেন, ‘‘স্বাধীনতার সময় যেমন ভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তেমন ভাবে আজকের দিনেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের মদত দেওয়া, মৌলবাদীর বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়াব।” এসএফআইয়ের দাবি, মৌলবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দেওয়ালে তাঁরা দেওয়াললিখন করবে। অঞ্জিল বলেন, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। যতই শাসানি দিন শুভেন্দু অধিকারী, আমরা দেওয়াললিখন জারি রাখব।”
ঘটনার সুত্রপাত গত ১৯ অগস্ট বুধবার রাতে। অভিযোগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকে তাণ্ডব চালান কিছু বহিরাগত। তার আগে বাম সমর্থকদের সঙ্গে বচসা, হাতাহাতি হয় দক্ষিণপন্থী ছাত্রদের। গভীর রাতে ক্যাম্পাসে ভাঙচুর, হামলা, অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে।
এখনও রয়ে গিয়েছে এই স্লোগান। নিজস্ব চিত্র।
এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল উঠে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, কলা বিভাগের বিভিন্ন দেওয়ালে দেশবিরোধী স্লোগান লেখা হয়েছে। তবে তিনিই প্রথম নন। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে বারুইপুরের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অভিযোগ করেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে লেখা হয় দেশবিরোধী স্লোগান, পড়াশোনার বদলে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলমাল এবং সংঘর্ষ প্রসঙ্গে শুভেন্দু প্রশ্ন তুলেছিলেন, কলাবিভাগের দেওয়ালে কেন ‘কিষেণজি রেড স্যালুট’ স্লোগান লেখা থাকে? কেন সেখান থেকে ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজ়াদি’ স্লোগান ওঠে? মুখ্যমন্ত্রীর এ মন্তব্যের পর, গত রবিবার দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে লেখা স্লোগানে সাদা প্রলেপ পড়েছে। আবার সোমবার সকালেই দেখা যায় সেই সাদা প্রলেপের উপরেই নীল কালিতে ফুটে উঠেছে কার্ল মার্ক্সের উক্তি— ‘‘... তোমাদের থেকে আমরা সহানুভূতি আশা করি না। তবে যখন আমাদের সময় আসবে, তখন আমরা বৈপ্লবিক শক্তি প্রয়োগ করতে একটুও দ্বিধা করব না।’’
উপরে মোদী ও শুভেন্দুর কাল্পনিক আলাপের ব্যানার, নীচে রবি ঠাকুরের গ্রাফিতি। নিজস্ব চিত্র।
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, রাতদখল আর দেওয়ালদখল এক বিষয় নয়। তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে স্লোগান লেখার পক্ষপাতী নন, তা-ও স্পষ্ট করে দেন। উপাচার্য বলেন, ‘‘দেওয়ালে রাজনৈতিক গ্রাফিতি আমি খুব একটা সমর্থন করি না। কিন্তু এটা যাদবপুরের বহু পুরনো সংস্কৃতি। বিদেশ থেকেও অনেক মানুষ ক্যাম্পাসে আসেন, এটা দেখতে খুব একটা ভাল লাগে না। দেশে এবং দেশের বাইরে কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আজকাল এ ভাবে স্লোগান লেখা হয় না।” তবে তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হতেই পারে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, কোনও আদর্শের উগ্রতা যেন অন্য পক্ষের ক্ষতি না করে। তাই পড়ুয়াদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এমন কিছু লেখা উচিত নয় যা, অন্যের ভাবাদর্শকে আঘাত করবে।’’
এ প্রসঙ্গে এবিভিপির যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি নিখিল দাস বলেন, “দেওয়াললিখন মুছে দেওয়ার পরেও যে ভাবে ফের দেওয়ালে লেখা হচ্ছে সেটা নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে আচার্য, মুখ্যমন্ত্রীর দফতর, উচ্চশিক্ষা দফতর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রারকে ই-মেল করে প্রতিবাদ জানিয়েছি আমরা।’’