মধ্যরাতে পুলিশ ঢুকেছে এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসে। নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে পড়ুয়াদের মধ্যে। বুধবার এ বিষয়ে বিবৃতি দিলেন কর্তৃপক্ষ, পাল্টা বিবৃতি জারি করলেন আন্দোলনকারী পড়ুয়ারাও। এক পক্ষের দাবি, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই ডাকা হয়েছিল পুলিশ। অন্য পক্ষ প্রশ্ন তুললেন, যে দু’দিন পড়ুয়ারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, সে দিন কেন এমন তৎপরতা দেখাননি কর্তৃপক্ষ?
মঙ্গলবার মধ্যরাতে এসআরএফটিআই (সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট) ক্যাম্পাসে ঢোকেন জনা ষাটেক পুলিশ কর্মী। তার পর থেকেই নতুন করে দানা বেঁধেছে বিতর্ক। প্রতিবাদে সরব হয়েছেন প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা। ক্যাম্পাসে পুলিশি নজরদারি এবং স্থায়ী ভাবে পুলিশ মোতায়েনের বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছে এসআরএফটিআই ছাত্র সংসদ।
পড়ুয়াদের অভিযোগ, তাঁদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন কর্তৃপক্ষ। অথচ পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে যখন উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তখন এই রকম তৎপরতা দেখা যায়নি। যদিও বুধবারই বিবৃতি জারি করে উপাচার্য সন্তোষ অজমেরা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ এবং ক্যাম্পাসে থাকা প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মঙ্গলবার গভীর রাতে ক্যাম্পাসে পুলিশ ডাকা জরুরি বলে মনে করা হয়েছিল। অজমেরা মনে করেন ক্যাম্পাসের বর্তমান আন্দোলনের নেপথ্য সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
২৭ অক্টোবর দেশ জুড়ে ক্যাম্পাস আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন এসআরএফটিআই-এর পড়ুয়ারা। তাতেই সংহতি জানিয়ে প্রতীকী বিক্ষোভ দেখিয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা, তাঁদের ক্যাম্পাসে। সংহতির বার্তা এসেছিল আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইএসআই-এর মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও। আগেই বলিউডের প্রবীণ প্রতিবাদী অভিনেতা নসীরুদ্দীন শাহ সংহতি জানিয়েছিলেন। শাসকের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সকলকে একজোট হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। ২৭ অক্টোবর, ক্যাম্পাসের বাইরে এসেছিলেন বাঙালি চিত্রপরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। পাশে থাকার বার্তা তিনিও দিয়েছেন এসআরএফটিআই পড়ুয়াদের। কিন্তু ক্যাম্পাসের দরজা খুলে তাঁকে ভিতরে ঢুকতে দেননি নিরাপত্তারক্ষীরা।
এসআরএফটিআই ক্যাম্পাস।
দিন ভর বিক্ষোভের পর ক্যাম্পাসের ভিতরেই মশাল মিছিলের আয়োজন করেন পড়ুয়ারা। উপাচার্যের দাবি, এতেই তিনি মনে করেছেন ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই পুলিশের সহায়তা প্রার্থনা করেছিলেন। বুধবার উপাচার্য জানান, সারাদিন বক্তৃতা ও শান্তিপূর্ণ জমায়েত হলেও সন্ধ্যার পর পড়ুয়াদের আন্দোলন যে দিকে মোড় নিয়েছিল, তাতে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারত। আগাম অনুমতি ছাড়াই পড়ুয়ারা জ্বলন্ত মশাল নিয়ে মিছিল করেন। সেই মিছিল হস্টেল এবং গেস্ট হাউসের দিকেও গিয়েছিল। প্রায় ৫০ জন পড়ুয়া জ্বলন্ত মশাল হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশে প্রায় এক ঘণ্টা ঘুরে বেড়ান। সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে স্লোগান দেন। যা একপ্রকার ভয় দেখানোরই সামিল।
উপাচার্যের দাবি, দিনের বেলাও মূল ফটকের বাইরে প্রতিবাদে যোগ দিয়েছিলেন বহিরাগতেরা। ফলে এটিকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বলা যায় না। পড়ুয়ারা নিজদের হাতে আইন তুলে নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে পারেন না। প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি এবং ক্যাম্পাসে থাকা মানুষের জীবনের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতেই গভীর রাতে ক্যাম্পাসে পুলিশ ডাকা হয়েছিল।
এসআরএফটিআই-এর আন্দোলনকে রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং বাইরে থেকে বহু মানুষ এতে উস্কানি দিচ্ছেন বলেও দাবি করছেন সন্তোষ অজমেরা। ছয় পড়ুয়াকে বহিষ্কার করা পরও তাঁরা ক্যাম্পাস রয়ে গিয়েছেন বলে উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি।
পড়ুয়াদের দাবি, মঙ্গলবার রাত প্রায় ১১টা নাগাদ ছাত্রাবাসের পিছনে অতিথিশালার কাছে পুলিশকর্মীদের জমায়েত হতে দেখা যায়। অথচ, তাঁদের মশালমিছিল কর্মসূচি শুরু হয়েছিল সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পরে ক্যাম্পাসে কেন বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হল তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন পড়ুয়ারা।এসআরএফটিআই-এর এক পড়ুয়া সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, “সন্ধ্যায় মশাল মিছিল বেরোল, আর উপাচার্য মধ্যরাতে নিরাপত্তার অভাব বোধ করে পুলিশ ডাকলেন, এটা খুবই হাস্যকর। আজও তিনি অফিসে এসেছেন পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী এবং বাউন্সার নিয়ে। এ দিকে ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি শুভমের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এসআরএফটিআই-এর ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।”
বিবৃতিতে পড়ুয়ারা প্রশ্ন তুলেছেন, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ আন্দোলনে কেন আতঙ্কিত উপাচার্য? কেন এই আন্দোলনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে মনে হচ্ছে তাঁর, সে ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তা ছাড়া, পড়ুয়াদের উপর হামলা এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন কেন একই রকম পুলিশি তৎপরতা দেখা যায়নি?
প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে ছাত্র সংসদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পুলিশি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের জায়গায় পরিণত করা যায় না। চলচ্চিত্র, শিল্পচর্চা, স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং মতপ্রকাশের জন্য তৈরি একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের নির্ভয়ে মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত। নিরাপত্তার নামে স্থায়ী পুলিশ মোতায়েন করা হলে ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
পড়ুয়াদের দাবি, শুধু কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হবে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। ক্যাম্পাসের প্রত্যেক সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। বিবৃতিতে ক্যাম্পাসে নজরদারি ও পুলিশি নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করার পাশাপাশি শিক্ষার গৈরিকীকরণের বিরোধিতা এবং পড়ুয়াদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার ডাক দেওয়া হয়েছে।