কর্তৃপক্ষকে বিবৃতি জারি করে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে অবিলম্বে। শুক্রবার এমনই দাবি তুললেন সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট-এর (এসআরএফটিআই) পড়ুয়ারা। অভিযোগ, পর পর দু’টি রবিবার তাঁদের প্রতিষ্ঠানে যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে শুধু যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তা-ই নয়। কলকাতা এবং কলকাতার বাইরে বদনাম হয়েছে প্রতিষ্ঠানের। পড়ুয়াদের দাবি, একাধিক প্রকল্পের কাজ আটকে গিয়েছে এই ঘটনার পর। কারণ অভিনেতা বা অন্য কলাকুশলীরা ক্যাম্পাসে আসতে রাজি হচ্ছেন না।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) একটি সংগঠনের কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়েছিল এসআরএফটিআই। এই কর্মসূচির প্রতিবাদ করায় পড়ুয়াদের উপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ ওঠে ‘অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত বা এবিজিপি-র (পশ্চিমবঙ্গ প্রান্ত)’ সদস্যদের বিরুদ্ধে। পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে মারধরের পাল্টা অভিযোগ তোলেন এবিজিপি-র সদস্য-সমর্থকেরা। ওই ঘটনার প্রতিবাদে গত ৪ অক্টোবর আর এক রবিবার প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’। সে দিন ফের গোলমাল হয়। ক্যাম্পাসে ঢোকার সব দরজা বন্ধ থাকলেও মিছিল করে এসে ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চের’ সদস্যেরা জড়ো হন। গেট ধরে ঝাঁকাতে থাকেন বলে অভিযোগ। গেটের ও পারে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে জমায়েত করেছিলেন পড়ুয়ারাও। পড়ুয়া এবং হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্যদের স্লোগানযুদ্ধের মধ্যেই পাথর এবং ঢিল ছোড়াছুড়ি চলতে থাকে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, গেটে টাঙানো অম্বেডকরের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়। ওই ঘটনার জেরে পঞ্চসায়র থানায় লিখিত অভিযোগ করেন ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার দীপক কুমার। পর পর দুই সপ্তাহে এই ঘটনার জেরে বিতর্ক শুরু হয়।
শুক্রবার পড়ুয়ারা দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দায়িত্ব নিতে হবে। দুঃখপ্রকাশ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য কী পদক্ষেপ করা হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। প্রশ্ন তোলা হয় নিজেদের ক্যাম্পাসের ভিতরে দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হওয়ার পরেও কেন ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ করা হল না?
পড়ুয়াদের অভিযোগ, হস্টেলে জায়গা না থাকার কারণে বহু ছাত্রছাত্রীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তাঁরা অনেকেই বাইরে থাকতে পারছেন না। অনেকে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গিয়েছেন। আবার অনেক পড়ুয়াকে ক্যাম্পাসের ভিতরে খালি কর্মী আবাসনে রাখা হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি, কর্তৃপক্ষ ওই ঘর খালি করার চাপ দিচ্ছেন। অথচ, পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে না।
শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়। ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন পড়ুয়ারা। এক ছাত্র শুক্রবার দাবি করেন, ইএম বাইপাসের উপর ওই বিশাল ক্যাম্পাসের বাইরে কোনও প্রশাসনিক নজরদারি নেই। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের জন্য সিগন্যাল খোলা হয়, অন্য পথচারীদের সঙ্গে পড়ুয়ারা দৌড়ে বাইপাস পার করেন। ক্যাম্পাসের বাইরে ফুটপাথ বা সার্ভিস রোডও ব্যবহারের অনুপযুক্ত। দীর্ঘ দিন ধরে মেট্রো স্টেশন তৈরি হওয়ার কারণে ক্যাম্পাসের আশপাশের অংশ পায়ে চলার অনুপযুক্ত। অথচ, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনও দিনই প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেননি বলে অভিযোগ।
সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে দাবি। এক ছাত্রের কথায়, “২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পঠনপাঠন বন্ধ। ক্লাসে আমরাও ফিরতে চাইছি। কিন্তু নিরাপত্তা আগে সুনিশ্চিত করতে হবে আগে মৌলিক সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি।” পড়ুয়া সুদীপ চক্রবর্তী জানান, তাঁরা দাবি করছেন যাতে কর্মসমিতি, সোসাইটির চেয়ারম্যান, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল, ফ্যাকাল্টি কাউন্সিল সব পক্ষ পড়ুয়াদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের কাজের সুবন্দোবস্তের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন।
পড়ুয়ারা বার বার অভিযোগ করেছেন, কর্তৃপক্ষ অসহযোগিতা করছেন। এমনকি উপাচার্য কোনও ভাবেই আলোচনায় বসতে রাজি নন বলে অভিযোগ। ছাত্র সংগঠনের তরফে শুভম দাবি জানান, “কর্তৃপক্ষের তরফে বিবৃতি প্রকাশ করে ওই দুই ঘটনার নিন্দা করতে হবে। কারণ, পড়ুয়াদের বাইরে বেরিয়ে কাজ করতে হয়। এই প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।”
পড়ুয়াদের অভিযোগ, সেপ্টেম্বরের পর থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ আটকে রয়েছে। শুটিং করার জন্য প্রয়োজনীয় লোকজনও ক্যাম্পাসে আসতে চাইছেন না। ফলে সমস্ত ক্ষতি হচ্ছে পড়ুয়াদের। তাঁদের দাবি, ঘটনায় পড়ুয়াদের সুনামও নষ্ট হয়েছে। এর বিরুদ্ধে বিবৃতি জারি করতে হবে এসআরএফটিআই কর্তৃপক্ষকে।
তবে এ দিন ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক কর্তা জানান, নবান্ন থেকে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে তদন্ত করা হচ্ছে। তাই এখনই কোনও পক্ষকে ‘দোষী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিবৃতি দেওয়া যায় না। তবে ওই ঘটনার নিন্দা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। ওই কর্তার কথায়, “ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে আমরা সচেতন। আপাতত কর্মী আবাসনে তাঁরা রয়েছেন। এখনই খালি করতে বলা হচ্ছে না। কিন্তু এটা স্থায়ী সমাধান নয়। গোটা বিষয়টিতে নজর রাখা হচ্ছে।”